ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে ৫০% ভর্তিনীতিতে জটিলতা, সমাধানের আশ্বাস টেকনিক্যাল কমিটির
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে মাদ্রাসা-কলেজ থেকে ৫০% ভর্তিনীতির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। অনুমোদিত নীতিতে ৫০ শতাংশ মাদ্রাসা এবং ৫০ শতাংশ কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থী ভর্তির কথা থাকলেও সাম্প্রতিক গুচ্ছ ভর্তি কার্যক্রমে সেই শর্ত মানা হয়নি। এ বিষয়ে টেকনিক্যাল কমিটি পরবর্তী মাইগ্রেশন থেকে সমন্বয়ের আশ্বাস দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৭ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে মাদ্রাসা ও কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০:৫০ অনুপাতে আসন বণ্টনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে চলমান ভর্তি কার্যক্রমে ওই নীতির প্রতিফলন দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল কমিটির সদস্যদের মতে আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে এ ইউনিট থেকে ৩২ জন, বি ইউনিট থেকে ৪০ জন এবং সি ইউনিট থেকে ৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তবে বিজ্ঞপ্তিতে মাদ্রাসা ও কলেজ শিক্ষার্থীদের সমান বণ্টনের কথা বলা হলেও ইউনিটভিত্তিক বণ্টনের স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় হিসাব নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে পরবর্তী মাইগ্রেশন থেকে সমন্বয় করা হবে বলে তারা জানান।
এ বিষয়ে গুচ্ছভুক্ত ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান ইউনিট থেকে বিভাগটিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া নবীন শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন, ভর্তি নির্দেশিকায় মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ শতাংশ হারে আসন বরাদ্দের বিষয়টি দেখেছিলাম। যদি পরে সেই শর্ত পরিবর্তন হয়ে থাকে, তবে তা শিক্ষার্থীদের প্রতি অন্যায় হবে। ভর্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত দেখিয়ে পরে তা বাস্তবায়ন না করা প্রতারণার শামিল। কারণ শিক্ষার্থীরা নির্দেশিকায় উল্লেখিত শর্তের ভিত্তিতেই সাবজেক্ট চয়েস দিয়েছে।
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার টেকনিক্যাল কমিটির দায়িত্বে থাকা সদস্য এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক ড. নাছির উদ্দিন খান বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবগত করা হয়েছে। পরবর্তী মাইগ্রেশনে সমন্বয়ের সুযোগ আছে।
অন্যদিকে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্রীয় টেকনিক্যাল কমিটির দায়িত্বে থাকা ইউএফটিবির রুবেল শেখ বলেন, আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মাকসুদুল হক তালুকদার বলেন‘যদি কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের আগেই কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা উচিত ছিল। আমি বর্তমানে এখানে রুটিন দায়িত্বে আছি। ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং এ সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো সরাসরি তদারকি করেছেন শিক্ষা শাখার কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য তাঁর সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।’
এ বিষয়ে উপ-রেজিস্ট্রার শহীদুল ইসলাম বলেন, মাদ্রাসা-কলেজ ভারসাম্য নীতি অনুযায়ী ভর্তি করানো হবে। প্রথম মেরিটে হয়তোবা এরকম পাওয়া যায়নি কিন্তু আগামী ম্যারিট থেকে এ শর্ত অনুযায়ী ভর্তি করানো হবে।
বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ইসলামী ও প্রচলিত আইনের সমন্বয়ে শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষে আইন ও শরিয়াহ অনুষদের অধীনে ‘আল-ফিকহ্’ বিভাগ চালু হয়। শুরুতে আরবিতে দক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হলেও পরবর্তীতে ভর্তি পদ্ধতিতে একাধিক পরিবর্তন আসে। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে মাদ্রাসা ও কলেজ পটভূমির শিক্ষার্থীদের সমানসংখ্যক ভর্তির ব্যবস্থা চালু করা হয়। পরে গুচ্ছভিত্তিক উন্মুক্ত ভর্তি নীতির আওতায় সেই ব্যবস্থা বাতিল হয়।
বিভাগের শিক্ষকদের দাবি, অনার্স ও মাস্টার্স মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার নম্বরের আরবি ও ফিকহভিত্তিক কোর্স রয়েছে। আরবিতে দুর্বল শিক্ষার্থীরা এসব কোর্সে পিছিয়ে পড়ায় ফলাফল খারাপ, রিটেক পরীক্ষা বৃদ্ধি এবং সেশনজটের মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৪০ জন মাদ্রাসা ও ৪০ জন কলেজ পটভূমির শিক্ষার্থীর জন্য আসন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. আলতাফ হোসেন বলেন, বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ভর্তি কার্যক্রমে কেন তা অনুসরণ করা হচ্ছে না, সে বিষয়ে আমি অবগত নই।
উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে গঠিত ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি কমিটি’র চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ধারা ১.২.১ এবং ৫.১৪ তে ভর্তির ক্ষেত্রে জেনারেল ও মাদ্রাসা থেকে সমান সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম বেধে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর ৫০% মাদ্রাসা থেকে নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। দুই ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ১০০ নম্বরের ইংরেজি অথবা আরবি ও ইসলামিয়াতও আবশ্যিক ছিল। বর্তমানে এই ভারসাম্য বিলুপ্ত। ধর্মতত্ত্ব অনুষদেও নেই জেনারেল শিক্ষার্থীদের ৫০% ভারসাম্য নীতি। শুধুমাত্র আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে তা পুনরায় কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও চলমান ভর্তি কার্যক্রমে নীতিটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।



























