রূপগঞ্জে কিশোর গ্যাং লিডার ‘কুত্তা শ্রাবণ’সহ গ্রেফতার ৪
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং লিডার শ্রাবণ ওরফে ‘কুত্তা শ্রাবণ’কে গ্রেফতার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। একই সঙ্গে তার তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এসআরবি বলছে, কোনো ব্যক্তি যদি তাদের অপরাধের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ দিত, তবে তাকেই সরাসরি টার্গেট করে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করতো শ্রাবণ ও তার বাহিনী। অভিযোগের খবর পেলে তারা বাদীর বাড়িতে গিয়ে তাণ্ডব চালাতো।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ।
গ্রেফতাররা হলেন—অস্ত্রধারী ও কিশোর গ্যাং লিডার শ্রাবণ (২০), তার গ্যাংয়ের সদস্য সিয়াম (২০), দিপু (১৯) ও কামরুজ্জামান (১৯)।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল মঙ্গলবার দিনগত রাত ১টার দিকে বিশেষ অভিযানে রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং কিশোর গ্যাং লিডার শ্রাবণকে তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, গ্রেফতার শ্রাবণ দীর্ঘদিন ধরে রূপগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় নিজস্ব কিশোর গ্যাং এবং সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আসছেন। তিনি রূপগঞ্জ ও তৎসংলগ্ন এলাকার কিশোর এবং উঠতি বয়সীদের নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং গড়ে তোলেন। সম্প্রতি রূপগঞ্জে ফল ব্যবসায়ী রনিকে হত্যা করেন শ্রাবণ ও তার অনুসারী গ্যাং সদস্যরা।
ওই হত্যাকাণ্ডের পর এলাকাবাসী গ্যাং লিডার শ্রাবণের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। তাছাড়া আসামি শ্রাবণের বিরুদ্ধে আগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেওয়ায় তিনি তার গ্যাং সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে রূপগঞ্জের তারাবো পৌরসভার টাটকি এলাকায় গভীর রাতে মামলার বাদী আমেনা বেগমের বসতবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার অপচেষ্টা চালান। এছাড়া ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা প্রকাশ্য দিবালোকে বাড়িঘরে অতর্কিত হামলা, ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাট চালান।
এসআরবির এ কর্মকর্তা বলেন, রূপগঞ্জ এলাকায় শ্রাবণের নেতৃত্বে কিশোর গ্যাং দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাণ্ডব চালিয়ে চরম আতঙ্ক তৈরি করে আসছে। সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম এই শ্রাবণ। তার বিরুদ্ধে হত্যা, হামলা, অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মারামারিসহ ১৮টি মামলা রয়েছে।
গ্রেফতারকালে তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, এক রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগাজিন এবং ছয়টি রামদা উদ্ধার করা হয়।
শ্রাবণের নামের আগে ‘কুত্তা’ শব্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি তার বাবার নামের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। তিনিও একাধিক মামলার আসামি, একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছিলেন। এই সূত্রেই শ্রাবণের নামের সঙ্গে ‘কুত্তা’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে।
অপরাধের ধরন জানতে চাইলে মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ বলেন, এক ঘটনায় মামলা করায় বাদীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে একই পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে জখম করেছিল শ্রাবণ ও তার বাহিনী। আমেনা বেগম নামের এক নারী মামলা করায় তার বাড়িতেও হামলা চালানো হয়। এমনকি গত মে মাসে এক ফল ব্যবসায়ীকে হত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এলাকাবাসী মানববন্ধনও করেন। তার এই তাণ্ডবের ভয়ে সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ দিতে সাহস পেত না।
শ্রাবণের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ ও আশপাশের থানায় মোট ১৮টি মামলা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঘটে যাওয়া বহুল আলোচিত ‘নাদিম অপহরণ’ মামলারও প্রধান আসামি শ্রাবণ। ওই অঞ্চলে মূলত চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল তার প্রধান কাজ। ২০২৪ সালেও যৌথবাহিনীর অভিযানে তিনি গ্রেফতার হন, ছয় থেকে সাড়ে ছয় মাস পর জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
রূপগঞ্জে কিশোর গ্যাং গ্রুপের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআরবির এ কর্মকর্তা বলেন, রূপগঞ্জের দুটি প্রধান কিশোর গ্যাং গ্রুপের একটি পরিচালনা করতেন শ্রাবণ, অন্যটি নবী গ্রুপ। এই বাহিনীর অধীনে ৫০-৬০ জন সদস্যের একটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল, যারা তাকে নিজেদের আইডল মনে করতো। গ্রেফতার এড়াতে শ্রাবণ কখনোই এক স্থানে অবস্থান করতেন না। একেক রাতে একেক এলাকায় আত্মগোপন করে থাকতেন।
বর্তমানে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কঠোর করতে গ্রেফতার অভিযানে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ প্রমাণ হিসেবে আদালতে জমা দেওয়ার নতুন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
গ্রেফতার আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে রূপগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ।



























