বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫:৪১, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

মোশাররফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আনোয়ার হোসেন আনু, উত্থানের নেপথ্যে কী?

মোশাররফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আনোয়ার হোসেন আনু, উত্থানের নেপথ্যে কী?
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনা এলাকায় একসময় অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা আনোয়ার হোসেন আনু এখন শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক। শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মোশাররফ হোসেন ওরফে শুভর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত আনোয়ারের উত্থান, বিমানবন্দরের লাগেজ ব্যবসা, ডিস ও ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের পেছনের উৎস নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, শুল্ক ফাঁকি, স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারের বাবা জালাল উদ্দিন সিভিল এভিয়েশনে সুইপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আর্থিক সংকটের মধ্যে বেড়ে ওঠা আনোয়ারের বিরুদ্ধে শৈশবে মানুষের বাড়ি থেকে কাপড় এবং মসজিদ থেকে জুতা চুরি করে পুরান ঢাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৬ সালে স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি মোশাররফ হোসেন ওরফে শুভর প্রধান সহযোগী হিসেবে আশকোনা এলাকায় চাঁদাবাজি, চুরি ও ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়েন বলে দাবি সূত্রের। এসব ঘটনায় তাকে একাধিকবার কারাগারেও যেতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিস ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০০২ সালে আশকোনা এলাকায় ডিস ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে মোশাররফের নির্দেশে আবু এবং পরবর্তী সময়ে তার ভাই ইসরাফিলকে হত্যা করা হয়। এরপর ডিস ও ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ আনোয়ারের হাতে চলে আসে। গত ১৮ বছর ধরে মোশাররফের প্রধান সহযোগী পরিচয়ে তিনি আশকোনা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলেও দাবি সূত্রের।

রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে আনোয়ারের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর গোল্ডেন শফিক, যার প্রকৃত নাম শফিকুল ইসলাম, এবং ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আনিছুর রহমান নাঈমের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন টেন্ডার ও অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে বিভিন্ন নেতাকর্মীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিদেশে অবস্থানরত মোশাররফের নির্দেশনায় আশকোনা ও আশপাশের এলাকায় এখনও চাঁদাবাজি এবং ডিস ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে আনোয়ারের বিরুদ্ধে।

এসব কর্মকাণ্ডে তার প্রধান সহযোগী হিসেবে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আক্তার ওরফে ‘ময়লা আক্তারের’ নাম এসেছে। এ ছাড়া বিএনপি নেতা সৈয়দ আরিফ হোসেন ওরফে ‘বাইট্টা আরিফ’, ডিস ব্যবসায়ী ইসরাফিলের ব্যবসায়িক অংশীদার সরোয়ার এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কাইয়ুম ও বাদশার নামও উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিমানবন্দরের লাগেজ ব্যবসা থেকে উত্থান

আনোয়ারের আর্থিক উত্থানের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে বিমানবন্দরের লাগেজ বহন ও ডোর টু ডোর কার্গো ব্যবসা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে কানা ফরিদ হত্যাকাণ্ডের পর মোশাররফের পরিচয়ে বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ বহনের কাজ শুরু করেন আনোয়ার। পরে তিনি ডোর টু ডোর কার্গো ব্যবসায় যুক্ত হন।

অভিযোগ রয়েছে, এ ব্যবসার আড়ালে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে লাগেজ বের করা, স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালান এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতেন তিনি। পাশাপাশি আশকোনা এলাকায় ডিস ও ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও নিজের হাতে রাখেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতিদিন বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৫০টি লাগেজ বের করা হতো। এর মধ্যে মাত্র ১০টির শুল্ক পরিশোধ করা হলেও বাকি ৪০টি শুল্ক ছাড়াই বের করে নেওয়া হতো। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের অর্থ উপার্জন করা হয়েছে বলে দাবি তাদের।

এ কাজে ব্যবহৃত লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান আই.এস.জে ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ঠিকানা ১৪৪, প্রেমবাগান, গাওয়াইর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার হিসেবে আনোয়ার তার বড় ভাই দুলাল হোসেনকে দেখাতেন। অন্যদিকে, ডিস ও ইন্টারনেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন তার বোন নিলুফা ইয়াসমিনের স্বামী মনির হোসেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, আনোয়ারের নিজের নামে বৈধ লাইসেন্স না থাকলেও অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তৎকালীন ম্যানুয়াল শুল্ক ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অনিয়ম করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, ব্যাংকের রসিদে নিজেরাই সিল দিয়ে শুল্ক পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখানো হতো।

এ ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের সাবেক কার্গো লোডার ও আওয়ামী লীগ কর্মী বুলবুল আহমেদ বুলুর সহায়তায় লাগেজ বের করা এবং একটি ট্রলিতে একাধিক ব্যক্তির লাগেজ একসঙ্গে পরিবহনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। 

এ বিষয়ে বুলবুল আহমেদ বুলুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ ব্যবসা থেকে প্রতিদিন ২০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। ২০১৮ সালের আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে শুল্ক কার্যক্রম পরিচালনার সময় এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ বেশি ছিল বলেও দাবি তাদের।

প্রতিযোগী ব্যবসায়ীদের কাজ দখলের অভিযোগ

বিমানবন্দরের লাগেজ ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি প্রতিযোগী ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে আনোয়ারের বিরুদ্ধে।

খান অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী ও সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী কবির খান বলেন, আনোয়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী মোশাররফের নাম ব্যবহার করে বিমানবন্দরে আসতেন। পরে বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের লাগেজ বহনের কাজ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করেন। বিমানবন্দরে কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জোর করে কাজ নিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।

কবির খান জানান, আনোয়ার তার ব্যবসার কাজ নিয়ে নেওয়ায় তিনি লোকসানের মুখে পড়েন এবং একপর্যায়ে ব্যবসা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, “সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সে জিরো থেকে কোটিপতি হয়ে গেছে স্বল্প সময়ের মধ্যে।”

কবির খান আরও দাবি করেন, আনোয়ারের নিজস্ব বৈধ লাইসেন্স ছিল না; অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তার মতে, স্বর্ণ ও অন্যান্য পণ্যের চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে আনোয়ারের পরিবারের বিপুল সম্পদ গড়ে উঠেছে।

লাগেজ ব্যবসার বাইরে স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানের সঙ্গেও আনোয়ারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের ভাষ্য, বিদেশ থেকে আসা বিভিন্ন পণ্য শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই বিমানবন্দর থেকে বের করে নেওয়া হতো। ওষুধ, বিশেষ করে ইনসুলিন আনার ক্ষেত্রেও শুল্ক পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। মানব পাচারের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।

২০০৭ সালের ডাকাতি মামলা

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ডাকাতির একটি মামলায় আনোয়ারকে প্রধান আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বৃহত্তর উত্তর থানায় দায়ের করা ওই মামলায় তিনি প্রায় দুই মাস কারাগারে ছিলেন বলে দাবি সূত্রের। একই ঘটনায় তার সহযোগী এমদাদও কারাগারে ছিলেন বলে জানা গেছে।

মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন টঙ্গী পূর্ব থানার সাবেক ওসি মনসুর। তাদের দাবি, তিনি ওই মামলায় আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করেছিলেন।

এছাড়াও ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর আশকোনার তালতলা এলাকায় আরেক ডিস ব্যবসায়ী মো. শাহজাহানকে (৪৫) কুপিয়ে হত্যা করেছে আনোয়ার ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী। তালতলা নাদ্দাপাড়া রূপালী গার্ডেনের সামনে তাকে হত্যা করা হয়।

৬০০ কোটি টাকার সম্পদ, কোথায় কী আছে

সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, আনোয়ারের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। তার সম্পদের তালিকায় রয়েছে দক্ষিণখানের আশকোনা উচারটেক এলাকার ১০৬ নম্বর বাড়ি। সরজমিনে দেখা যায়, উচারটেক জামে মসজিদের পাশেই সাততলা ভবনটি ছাবিলুল আলম মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এছাড়া
হজক্যাম্পসংলগ্ন পারভীন হোটেলের পেছনে ৩৫৬ নম্বর বাসার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ষষ্ঠ তলায় ই-৪ ও এফ-৪ নম্বরের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর একটিতে বর্তমানে আনোয়ারের বড় ভাই দুলাল হোসেন এবং অন্যটিতে তার বোন নিলুফা ইয়াসমিন পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।

আনোয়ার নিজে পরিবার নিয়ে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে দুই কোটি টাকার বেশি মূল্যের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া কাচকুড়া সেতুসংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশে প্রায় দুই বিঘা জমির মালিক এই আনোয়ার। জমিটির আনুমানিক মূল্য ৫০ কোটি টাকা। গুলশানে প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের একটি প্লট এবং প্রায় ১০ কোটি টাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের কথাও বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সম্পর্কিত বিষয়:

জনপ্রিয়