বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:০২, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়

১৫৪ জুলাই যোদ্ধার বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় ৩৮৭ কোটি

১৫৪ জুলাই যোদ্ধার বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় ৩৮৭ কোটি
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের আবাসন নিশ্চিতের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শহীদ পরিবারের জন্য ৮০৪টি এবং জুলাই যোদ্ধাদের জন্য ১ হাজার ৫৬০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি হারানো ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের দেশে-বিদেশে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিদেশে চিকিৎসার পাশাপাশি শহীদ পরিবারকে সঞ্চয়পত্র, জুলাই যোদ্ধাদের এককালীন অনুদান এবং শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের গত ছয় মাসের কার্যক্রম এবং ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতিও উপস্থাপন করা হয়।

বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আহত জুলাই যোদ্ধাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ১৫৪ জুলাই যোদ্ধার বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি ২২ লাখ ১১ হাজার ৯৩৩ টাকা। এ ছাড়া বিদেশে চিকিৎসা, শহীদ পরিবারের সঞ্চয়পত্র, জুলাই যোদ্ধাদের এককালীন অনুদান এবং শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের মাসিক ভাতা—সব মিলিয়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫ কোটি ৮২ লাখ ২০ হাজার ৩১২ টাকা।

এ ছাড়া জুলাই শহীদ পরিবার এবং স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতাহীন গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ২৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ‘জুলাই শহীদ পরিবার; স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতাহীন; গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও জীবনযাপনের মান উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

শহীদ পরিবারকে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন আইন, ২০২৬’-এর আওতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং মাসিক ২০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত ৮৪২ জন শহীদের নাম গেজেটভুক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮১৩ জন শহীদের উত্তরাধিকারীদের সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ভাতা দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৯টি পরিবারের ক্ষেত্রে ওয়ারিশগত জটিলতা ও অভিযোগ থাকায় তদন্ত চলছে।

অন্যদিকে গেজেটভুক্ত ১৪ হাজার ৩৬৮ জন জুলাই যোদ্ধার মধ্যে ১৩ হাজার ৫৩৬ জনকে মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ক-শ্রেণির যোদ্ধারা মাসে ২০ হাজার, খ-শ্রেণির ১৫ হাজার এবং গ-শ্রেণির যোদ্ধারা ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন।

নতুন করে জুলাই যোদ্ধা তালিকাভুক্তির সুযোগ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জুলাই যোদ্ধাদের তালিকা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। কমিটির সদস্যরা বলেন, অনেক প্রকৃত অংশগ্রহণকারী আহত বা নিহত না হওয়ায় কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ না থাকায় তালিকাভুক্তির সুযোগ পাননি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও কমিটির সদস্য আহমেদ আযম খান বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা আবেদন ও তালিকাভুক্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে অনেকেই অবগত ছিলেন না। দেশব্যাপী ব্যাপক অনুরোধ আসায় মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে পুনরায় আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও তালিকাভুক্তির কার্যক্রম উন্মুক্ত করেছে।

তিনি বলেন, প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের শনাক্ত করতে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হবে। একই সঙ্গে অযোগ্য কেউ যাতে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে না পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

জানা যায়, নির্বাচনি ইশতেহারে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য গত ২০ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি পাঠায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের সব জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ৭৮টি সরকারি স্থাপনার নাম জুলাই শহীদদের নামে করার তথ্য পাওয়া গেছে।

মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ২ হাজার ১০২টি বীরনিবাস নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এ অর্জন হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এ ছাড়া অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আরও ৩ হাজার বীরনিবাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ’ নামে একটি প্রকল্প এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্ভাব্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজও চলছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ৮৭ হাজার ৭৫৪ জনের লাইভ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ৪৮ হাজার ২৪৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার ২ লাখ ১০ হাজার ৬৪১ জন ওয়ারিশের তথ্য ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গেজেটভুক্ত ১ হাজার ৩৯৯ জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার রাষ্ট্রীয় সম্মানি ভাতা গ্রহণ না করায় তাদের উত্তরাধিকারীদের তথ্য জানতে জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়।

জেলা প্রশাসকদের প্রতিবেদনে ১ হাজার ১৯১ জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার তথ্য পাওয়া যায়। যাচাই-বাছাইয়ে ৪৯৯ জনের কোনো ওয়ারিশ পাওয়া যায়নি বা ওয়ারিশ নেই। ১১ জন ভাতা নিতে আগ্রহী নন। ১৩ জন সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা নিচ্ছেন। ১৯৮ জনের নতুন করে ভাতা চালু করা হয়েছে এবং ৪৩ জনের ভাতা চালু আছে বা এ-সংক্রান্ত নথি পাওয়া গেছে। তবে আরও ২০৮ জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার তথ্য পাওয়া যায়নি।

বৈঠকে জানানো হয়, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের কৌশল নির্ধারণে গত ১২ আগস্ট বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)।

২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল জারি করা ১৯২ নম্বর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের জানান, ৮৪৩টি শহীদ পরিবার ও ১৪ হাজার ৩৬৮ জন জুলাই যোদ্ধার গেজেট প্রকাশ, আর্থিক সহায়তা ও মাসিক ভাতা দেওয়া হয়েছে। আহত জুলাই যোদ্ধাদের দেশে-বিদেশে চিকিৎসা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও আবাসনের কার্যক্রমও চলছে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে গড়ে মাসে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা ভাড়া আয় হয়।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট মোট ৪ হাজার ২৩৪টি মামলা রয়েছে বলে স্থায়ী কমিটিকে জানানো হয়। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৩৩টি রিট, ৩৬টি আপিল, ১৪টি রিভিউ, ৮৩টি কনটেম্পট এবং ১৫৫টি দেওয়ানি মামলা। এসব মামলা সরকারের স্বার্থের অনুকূলে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সূত্র: কালবেলা

সম্পর্কিত বিষয়:

জনপ্রিয়