সড়কে আইন ভাঙার তথ্য দিলেই ব্যবস্থা, আসছে নতুন ফিচার
ঢাকার সড়কে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা যেন নিত্যদিনের চিত্র। কখনো সিগন্যাল অমান্য করে ছুটছে গাড়ি, কখনো চলছে উল্টো পথে। কোথাও ফুটপাত দখল করে রাখা হচ্ছে গাড়ি, আবার কোথাও নির্ধারিত লেনের তোয়াক্কা না করেই চলছে যানবাহন। এসব অনিয়মের অনেক ঘটনাই সাধারণ মানুষের চোখের সামনে ঘটলেও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু করার সুযোগ থাকে না। এবার সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে চায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
সড়কে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা নাগরিকদের কাছ থেকেই সরাসরি জানতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপি। এ লক্ষ্যে ‘হ্যালো ডিএমপি’ মোবাইল অ্যাপে নতুন একটি ফিচার যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো নাগরিক রাস্তায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা দেখতে পেলে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের কাছে পাঠাতে পারবেন। তথ্যদাতার নাম-পরিচয় গোপন রাখবে পুলিশ।
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, নাগরিকের পাঠানো ছবি বা ভিডিও পেলেই সরাসরি মামলা করা হবে না। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রথমে সেটি যাচাই-বাছাই করা হবে। পাঠানো ছবি বা ভিডিওর সত্যতা, ঘটনার স্থান ও সময় এবং কী ধরনের আইন লঙ্ঘন হয়েছে—এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পর নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট গাড়ি বা চালকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মামলা হতে পারে।
নতুন ব্যবস্থায় কোনো নাগরিক সড়কে ট্রাফিক আইন অমান্যের ঘটনা দেখলে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে ‘হ্যালো ডিএমপি’ অ্যাপের নির্দিষ্ট অপশনের মাধ্যমে পাঠাতে পারবেন। একই সঙ্গে ঘটনার প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার সুযোগও থাকবে। পরে ডিএমপির সংশ্লিষ্ট ইউনিট পাঠানো কনটেন্ট যাচাই করবে।
ছবি বা ভিডিওতে গাড়ির নম্বর, আইন লঙ্ঘনের ধরন, ঘটনাস্থল ও সময়সহ প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে সেগুলো মিলিয়ে দেখা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট গাড়ি বা চালকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকার মতো জনবহুল মহানগরে বিপুলসংখ্যক সড়ক ও যানবাহনের ওপর সব সময় পুলিশের সরাসরি নজরদারি রাখা কঠিন। ট্রাফিক পুলিশ নির্দিষ্ট পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করলেও একই সময়ে নগরীর প্রতিটি সড়ক, অলিগলি ও মোড়ে নজরদারি করা সম্ভব হয় না। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে নাগরিকদের হাতে থাকা স্মার্টফোনের ক্যামেরাকে তথ্যের উৎস হিসেবে কাজে লাগাতে চায় ডিএমপি।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, শিগগির হ্যালো ডিএমপি অ্যাপে একটি ফিচার যুক্ত করা হবে। ফিচার ব্যবহার করে সড়ক থেকে যে কেউ মুহূর্তেই ডিএমপি সদর দপ্তরে পাঠিয়ে দিতে পারবেন আইন ভাঙার তথ্য। তথ্যটি যাচাই-বাছাই শেষে ট্রাফিক বিভাগ আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
ফলে কোনো নাগরিক চলন্ত অবস্থায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করলে সেটির ছবি বা ভিডিও ধারণ করে পুলিশের কাছে পাঠানোর সুযোগ পাবেন। এতে পুলিশের প্রচলিত নজরদারির বাইরে থেকে যাওয়া কিছু ঘটনাও পরবর্তী সময়ে যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে।
এ উদ্যোগ কার্যকর হলে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। এতদিন অনেক ট্রাফিক অপরাধ শনাক্তে পুলিশ সদস্যের সরাসরি উপস্থিতি কিংবা এআই ক্যামেরার ফুটেজের ওপর নির্ভর করতে হতো। এর সঙ্গে নাগরিকদের পাঠানো ছবি ও ভিডিও যুক্ত হলে আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্তে আরও একটি তথ্যসূত্র তৈরি হবে।
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তথ্য প্রদানকারী নাগরিকের পরিচয় গোপন রাখা। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ জানাতে গিয়ে কেউ যাতে ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক ঝুঁকির মুখে না পড়েন, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য তথ্যদাতার নাম, পরিচয় ও মোবাইল নম্বর গোপন রাখবে পুলিশ।
তবে নাগরিকদের সরাসরি যুক্ত করার এই ব্যবস্থায় অপব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে। ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর ছবি বা ভিডিও পাঠাতে পারেন। তাই শুধু অভিযোগ পাওয়ার ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রতিটি তথ্য যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ডিএমপি।
কোনো ছবি বা ভিডিও সম্পাদিত কি না, সেটি পুরোনো কোনো ঘটনার কি না, ঘটনার স্থান ও সময়ের সঙ্গে দেওয়া তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও যাচাই করা হবে। এরপরই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে নেওয়া হবে আইনগত পদক্ষেপ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা কঠিন। এজন্য নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। ‘হ্যালো ডিএমপি’র নতুন ফিচার সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে।
নাগরিকরা যদি দেখেন তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে সত্যতা পাওয়ার পর বাস্তবেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের রিপোর্টিংয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে। এর ফলে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্তের পাশাপাশি সড়কে আইন মানার প্রবণতাও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘হ্যালো ডিএমপি’ অ্যাপে ট্রাফিক ভায়োলেশন রিপোর্টিং ফিচার চালু হলে এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত সুবিধা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে পুলিশ ও নাগরিকের মধ্যে সহযোগিতার নতুন একটি মডেল তৈরি হতে পারে। একদিকে ট্রাফিক আইন মানার বিষয়ে সচেতনতা বাড়বে, অন্যদিকে সড়কে কেউ আইন ভাঙলে তার ছবি বা ভিডিও নাগরিকদের হাতে থাকা মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ হয়ে পুলিশের কাছে পৌঁছাতে পারে—এমন ধারণা থেকেও অনেকে সতর্ক হবেন।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘শিগগির হ্যালো ডিএমপি অ্যাপে একটি ফিচার যুক্ত করা হবে। ফিচার ব্যবহার করে সড়ক থেকে যে কেউ মুহূর্তেই ডিএমপি সদর দপ্তরে পাঠিয়ে দিতে পারবেন আইন ভাঙার তথ্য। তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে ট্রাফিক বিভাগ আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। এতে সড়কে একদিকে যেমন শৃঙ্খলা ফিরবে অন্যদিকে সচেতনতাও বাড়বে।’
সূত্র: জাগোনিউজ২৪



























