রংপুর অঞ্চলে ১ লাখ হেক্টরে স্বল্পমেয়াদি আমন চাষ
স্বল্পমেয়াদি জাতের আমন ধান কাটা শুরু হওয়ায় এর নতুন চাল রংপুর কৃষি অঞ্চলে কৃষকদের ঘরে ঘরে ‘নবান্ন’ উৎসবের আনন্দ বয়ে এনেছে। এর পাশাপাশি এটি কৃষি শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করেছে।
এই অঞ্চলের পাঁচটি জেলার গ্রামীণ পরিবারগুলোতে নানা স্বাদের পিঠা-পুলি ও সুস্বাদু খাবার তৈরির মাধ্যমে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী ‘নবান্ন’ উৎসব উদযাপনের ধুম পড়েছে।
আগাম জাতের এই আমন ধান ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি উপকৃত করার পাশাপাশি ‘আশ্বিন’ ও ‘কার্তিক’ মাসের মরা কার্তিকের কর্মহীন সময়ে কৃষি শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচটি জেলাতেই স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ ইতোমধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এটি এমন এক সময়ে কাটার সুযোগ করে দেয়, যখন সাধারণত কৃষি ক্ষেত্রে কোনো কাজ থাকে না। ফলে মৌসুমভিত্তিক কাজের অভাবের দিনেও কৃষি শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অতীতে ‘আশ্বিন’ ও ‘কার্তিক’ মাসে কৃষিকাজ না থাকায় দারিদ্র্যপীড়িত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো, যা স্থানীয়ভাবে ‘মঙ্গা’ নামে পরিচিত ছিল। এই মঙ্গা বহু দশক ধরে দরিদ্র ও কৃষি শ্রমিকদের জন্য অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ডেকে আনতো।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বাসসকে জানান, চলতি বছর এই অঞ্চলে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমি থেকে ২০ লাখ ৫ হাজার ২৮ টন চাল (ধানের হিসাবে ৩০ লাখ ৭ হাজার ৫৪২ টন) উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কৃষকরা শেষ পর্যন্ত ৬ লাখ ২১ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করেছেন, যা এই অঞ্চলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪০ হেক্টর বেশি।
এর মধ্যে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় ১ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত চাষ করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কৃষকরা ৫ হাজার ৫০০ হেক্টরেরও বেশি জমির আমন ধান কেটে ফেলেছেন এবং প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩.১৫ টন চালের (ধানের হিসাবে ৪.৭২৫ টন) চমৎকার ফলন পেয়েছেন।
কৃষকরা এখন ব্রি ধান ৭৫, বিনা ধান ৭, বিনা ধান ১৬, বিনা ধান ১৭ ও বিনা ধান ৭৫-এর মতো স্বল্পমেয়াদি (১০০ থেকে ১১০ দিন মেয়াদি) ও উচ্চফলনশীল জাত এবং টিয়া, ময়না, ধান গোল্ড ও এসিআই-এর মতো হাইব্রিড জাতের ধান কাটছেন।
স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটা আগামী নভেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত চলবে। এরপর সব জাতের আমন ধান পুরোদমে কাটার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, “স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটার পর কৃষকরা একই জমিতে আলু, সরিষা, শাকসবজি এবং অন্যান্য শীতকালীন ফসলের আগাম জাত চাষ করে অধিক মুনাফা অর্জন করছেন, যা কৃষি শ্রমিকদের জন্য কাজের বাড়তি সুযোগ তৈরি করছে।”
খাদ্য নিরাপত্তায় স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১৮ প্রাপ্ত ড. এম এ মজিদ বলেন, স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটা এবং একই জমিতে শীতকালীন ফসলের আগাম চাষাবাদের ফলে এমন এক সময়ে কাজের সুযোগ তৈরি হয়, যখন সাধারণত কাজের বেশ সংকট থাকে।
রংপুর অঞ্চল থেকে মৌসুমভিত্তিক বেকারত্ব দূর করার লক্ষ্যে ২০০৬ সাল থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং অন্যান্য সংস্থা যৌথভাবে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ সম্প্রসারণে একযোগে কাজ শুরু করে।
ব্রি’র সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মজিদ বলেন, “২০১০ সালের মধ্যেই স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের ব্যাপক চাষাবাদের ফলে আশ্বিন ও কার্তিক মাসে প্রতিবছর ঘটে যাওয়া কর্মসংস্থান ও জীবিকার সেই সাময়িক সংকট বা মঙ্গা পুরোপুরি দূর হয়ে যায়।”
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ভীমপুর গ্রামের কৃষক মাহবুবুর রহমান, নারায়ণ চন্দ্র সেন ও আজিজার রহমান জানান, তারা ইতোমধ্যে তাদের চাষ করা স্বল্পমেয়াদি বিনা ধান-১৭ জাতের ধান কেটেছেন এবং চমৎকার ফলন পেয়েছেন।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার আগাছত্রা গ্রামের কৃষক আইয়ুব আলী বলেন, তিনি ইতোমধ্যে তার জমিতে চাষ করা হাইব্রিড ধান ‘গোল্ড’ জাতের ধান কেটে শেষ করেছেন এবং বেশ ভালো ফলন পেয়েছেন।
স্থানীয় বাজারে সদ্য কাটা আমন ধানের ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ এবং কাঁচা খড় লাভজনক দামে বিক্রি করে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে সরবরাহ করছেন কৃষকরা।



























