বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২:১৯, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বন অধিদপ্তরে বদলি-পদায়নে লাখ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ

বন অধিদপ্তরে বদলি-পদায়নে লাখ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ
ছবিঃ সংগৃহীত

বন অধিদপ্তরে বদলি ও পদায়নে লাখ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন এবং পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদায়নে ৫০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পেয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা ও চেকপোস্টের স্টেশন কর্মকর্তা পদায়নেও নির্ধারিত ঘুষের হার থাকার তথ্য উঠে এসেছে।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নতুন পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মাসিক মাসোহারা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে দেড় বছর আগে অভিযান চালিয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদনে প্রশ্ন উঠেছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুদকের মুখপাত্র ও উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানান, এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান ও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন ২০০৪ সালের নীতিমালা অনুযায়ী হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে বনাঞ্চলের বিভিন্ন রেঞ্জ, স্টেশন ও বিভাগীয় বন কার্যালয়কে শ্রেণিভেদে ভাগ করে অর্থের বিনিময়ে পদায়নের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির রেঞ্জ কর্মকর্তা পদায়নে ১৫ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এক বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির চেকপোস্টে স্টেশন কর্মকর্তা পদায়নে ২০ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য পেয়েছে দুদক।

অন্যদিকে, দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদায়নে ৫০ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নতুন পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা, চেকপোস্টের স্টেশন কর্মকর্তা ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের মাসিক মাসোহারা দিতে হতো বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ব্যবস্থার সঙ্গে বন অধিদপ্তরের একটি সিন্ডিকেট জড়িত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

সুফল প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

বন অধিদপ্তরের দেড় হাজার কোটি টাকার টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জের জোয়ারিয়ানালা বিটে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৮৭২ হেক্টর এলাকায় নার্সারি ও বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫১০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে আনুমানিক ১৬০ হেক্টরে চারা লাগানো হয়েছিল। বাকি এলাকায় বনায়ন না করে শুধু সীমানা নির্ধারণের জন্য দুই সারি চারা লাগানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও চারা রোপণ না করেই বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যেসব এলাকায় বাগান করা হয়েছিল, সেখানেও নিয়মিত পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি ছিল। ফলে অনেক চারা প্রথম বছরেই মারা যায়। কোনো কোনো এলাকায় বাগানের অস্তিত্ব না থাকলেও সাইনবোর্ডে চারার সংখ্যা ও গাছের প্রজাতির বিবরণ দেওয়া ছিল।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও ৩৬২ হেক্টর এলাকায় বনায়ন ও নার্সারি সৃজনের উদ্যোগেও একই ধরনের অনিয়মের চিত্র পাওয়া যায়। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সুফল প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায় ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সুপারিশ করে দুদক।

এর আগে ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ এবং বদলি-পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগে বন ভবনে অভিযান চালায় দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম। অভিযানে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, উপপ্রধান বন সংরক্ষক ও সুফল প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায়সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়।

পাখি আমদানির আড়ালে অর্থপাচারের অনুসন্ধান

বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগেও নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এ ঘটনায় প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে শুরু করে বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে।

দুদকের নথি অনুযায়ী, এ অভিযোগ অনুসন্ধানে একজন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ এবং পরিচালককে (মানিলন্ডারিং) তদারককারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪, দুদক বিধিমালা, ২০০৭, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯ অনুযায়ী অনুসন্ধান শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানকালে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ বা সম্পদ-সম্পত্তি ক্রোক করা হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে কমিশনের সংশ্লিষ্ট শাখাকে লিখিতভাবে জানাতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনপ্রিয়