রোববার ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৫৪, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে লালমনিরহাটের মসজিদ-মন্দির

সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে লালমনিরহাটের মসজিদ-মন্দির
ছবিঃ সংগৃহীত

লালমনিরহাট জেলা শহরের কালীবাড়ী এলাকায় একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একদিকে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে পূজার ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি ও ঢাকের শব্দ। উপাসনার ধরন আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও বোঝাপড়ায় দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী এলাকার পুরান বাজার জামে মসজিদ ও পুরান বাজার কালীবাড়ী কালী ও দুর্গামন্দিরের এ সহাবস্থান স্থানীয়দের কাছে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক বন্ধনের পরিচিত দৃষ্টান্ত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মসজিদ ও মন্দিরের মধ্যবর্তী দূরত্ব মাত্র দুই থেকে তিন ফুট। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মন্দিরের আঙিনায় ভক্তদের সমাগম ও পূজার আনুষ্ঠানিকতা চলছে। পাশেই মসজিদে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নামাজের সময় মন্দিরে বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখা হয়। পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করে থাকেন।

দুর্গাপূজা ও মসজিদ-মন্দিরের সহাবস্থান দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। তাদের কেউ এ পরিবেশে মুগ্ধ হন, কেউ আবার স্থানীয়দের কাছ থেকে দীর্ঘদিনের দুই সম্প্রদায়ের মানুষের সম্প্রীতির অভিজ্ঞতা শোনেন।

কুড়িগ্রাম থেকে আসা আব্দুল রহমান (৬০) বলেন, একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের সহাবস্থান তাকে মুগ্ধ করেছে। কয়েক যুগ ধরে এখানে কোনো বিরোধের ঘটনা না ঘটাকে তিনি মানবতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।

বগুড়া থেকে আসা নারায়ণ চক্রবর্তী (৫০) বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে সুযোগ পেলে তিনি প্রতিবছর এখানে আসেন। মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান তাকে বারবার সম্প্রীতি ও শান্তির বার্তা দেয়।

পুরান বাজার জামে মসজিদের পেশ ইমাম মো. আলাউদ্দিন বলেন, দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে চলেন। তাদের মধ্যে কখনো কথা-কাটাকাটিও হয়নি। মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় হয় বলেও জানান তিনি। তার মতে, পারস্পরিক সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধই দীর্ঘদিনের এ সম্পর্কের ভিত্তি।

মন্দির কমিটির সভাপতি ও পুরোহিত শঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, নামাজের সময় তারা বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখেন। পূজা চলাকালে মুসলিম প্রতিবেশীরাও তাদের সহযোগিতা করেন। দুর্গাপূজায় ভক্তদের ভিড় হলেও মুসল্লিদের নামাজ আদায়ে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৩৬ সালে কালীবাড়ী কালীমন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ওই এলাকায় আসা ব্যবসায়ীরা মন্দির-সংলগ্ন খালি জায়গায় ঘাসের ওপর জায়নামাজ বা চাদর বিছিয়ে নামাজ আদায় করতেন। পরবর্তী সময়ে, ১৯১৫ সালের দিকে সেখানে মসজিদ নির্মিত হয়। বর্তমানে এটি পুরান বাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিত। সেই থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দুটি পাশাপাশি নিজ নিজ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরের জমির পরিমাণ ৮ শতাংশ এবং মসজিদের ৫ শতাংশ। মাঝখানে প্রায় ১২ শতাংশ জমির মালিক অন্য একজন। মন্দির ও মসজিদ কমিটির সদস্যদের ভাষ্য, ওই জমির মালিক কখনো জায়গাটি দখলে নেওয়ার আগ্রহ দেখাননি।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম দুলাল বলেন, দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপনে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সব সময় সহযোগিতা করা হয়।

তিনি বলেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধার এ সম্পর্ক ধর্মীয় সম্প্রীতির পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যেরও বার্তা দেয়।

গত শুক্রবার রাতে কালীবাড়ী দুর্গামন্দির পরিদর্শনকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান দুই ধর্মের মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা, মানবিকতা ও শ্রদ্ধাবোধের প্রতিফলন। এ সম্প্রীতি লালমনিরহাট জেলাকে দেশজুড়ে পরিচিত করেছে উল্লেখ করে তিনি এর বন্ধন অটুট রাখতে সবাইকে সহনশীল ও মানবিক থাকার আহ্বান জানান।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দুর্গাপূজায় বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম হলেও এখানে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি। প্রতিবছর বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং তিনি নিয়মিত নিরাপত্তার খোঁজখবর রাখেন।

জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান বলেন, মন্দির ও মসজিদের পাশাপাশি অবস্থান ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের একটি দৃষ্টান্ত।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়