মূল্যস্ফীতি ফের ৯% ছাড়াল, চাপে ভোক্তা
আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরছে দেশের মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে কমছে আয় বৃদ্ধির গতি। অর্থাৎ মানুষের আয় কমলেও বাড়ছে ব্যয়। ফলে বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও চাপে পড়ছে।
সরকারি হিসাবে, ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, অথচ একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে হয়েছে ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ। অর্থাৎ পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেই তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়ল।
রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ভোক্তা মূল্য সূচকের (সিপিআই) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। বিবিএস বলছে, গত ফেব্রুয়ারি জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এর মানে হলো, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম।
সিপিআই তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি হার পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে হয়েছে ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ। জানুয়ারি মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং এক বছর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ গত এক বছরে মজুরি বৃদ্ধির হারও ধীরে ধীরে কমেছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারিতে কৃষি খাতে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ, শিল্প খাতে ৭.৯৯ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮.২০ শতাংশ। আগের মাস জানুয়ারিতে যা ছিল যথাক্রমে ৮. ১২, ৭.৯৮ ও ৮.২৪ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে মজুরি বৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৮.৩৪, ৭.৮০ এবং ৮.৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ কৃষি ও সেবা খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার গত বছরের তুলনায় কমেছে। শিল্প খাতে সামান্য উন্নতি হলেও তা সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
অন্যদিকে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরছে দেশের মূল্যস্ফীতি। গত কয়েক মাসের ধারাবাহিকতায় গত ফেব্রুয়ারিতেও বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। এ সময় খাদ্যপণ্যের সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে, যা সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের পকেটের ওপর বেড়েছে চাপ। ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির চাপ শহরের চেয়ে গ্রাম এলাকায় বেশি, আর খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি শহরে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ফেব্রুয়ারি মাসের প্রতিবেদন বলছে, খাদ্যপণ্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, আগের মাস জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ০ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
এর আগে গত বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশের অর্থ হলো ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যে পণ্য বা সেবা কিনতে ১০০ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই একই পণ্য কিনতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ১৩ পয়সা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে একই পণ্য কিনতে খরচ বেড়েছে ৯ টাকা ১৩ পয়সা।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক বেশি। ফেব্রুয়ারিতে গ্রামীণ এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ২১ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রামে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বিপরীতে শহর এলাকায় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯.০৭ শতাংশ।
গড় মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশ হলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩০ শতাংশ। গড় মূল্যস্ফীতির চাপ গ্রামে বেশি হলেও শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে শহর এলাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, সেখানে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে গ্রামে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, কিন্তু মজুরি বেড়েছে মাত্র ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ। অর্থাৎ একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় পাশাপাশি মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে প্রায় ১ শতাংশ পয়েন্টের বেশি।
মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশের অর্থ হলো ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যে পণ্য বা সেবা কিনতে ১০০ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই একই পণ্য কিনতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ১৩ পয়সা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে একই পণ্য কিনতে খরচ বেড়েছে ৯ টাকা ১৩ পয়সা। অন্যদিকে একই সময়ে মানুষের আয় বেড়েছে ৮ টাকা ০৬ পয়সা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে আয়ের থেকে ব্যয় বেড়েছে ১ টাকা ১৩ পয়সা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলা থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাসের মজুরি হার সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। এই তথ্য বলছে, সামগ্রিকভাবে শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধির গতি কমছে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, যা অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।



























