মঙ্গলবার ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

মারিয়া সালাম

প্রকাশিত: ১৫:৪১, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এপিস্টেন ফাইল এবং সিরিয়ার কুর্দি শিশুরা

এপিস্টেন ফাইল এবং সিরিয়ার কুর্দি শিশুরা
ছবি: গ্রাফিক্স

ইস্তাম্বুলে আমার শেষ সন্ধ্যা। ইফতারের পর ইতস্তত হাঁটছি তাসকিম স্কয়ারে। মারমারা থেকে ভেসে আসা ঝিরঝিরে বাতাসে ভুট্টা পোড়া আর কফির গন্ধ। পাথরের তৈরি শক্ত জমিনে হিল পায়ে হাঁটতে গিয়ে টের পেলাম পায়ে ভয়ানক ব্যথা। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশের একটা বেঞ্চে বসে জুতা খুলে ব্যথার জায়গাটায় হাত বুলাচ্ছি। 

হঠাৎ সামনে দুটি দেবশিশু হাত ধরাধরি করে এসে দাঁড়াল। ছেলেটার বয়স সম্ভবত ৮/৯ আর মেয়েটা ৫/৬। তাদের আরেক হাতে কাগজের তৈরি গারল্যান্ড। মিষ্টি করে হাসল দু'জন। তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম, তারা সম্ভবত কুর্দি ভাষাভাষী। একটা শব্দ 'সুরিয়া' অর্থাৎ সিরিয়া শুনেই আন্দাজ করলাম এরা সিরিয়ান কুর্দি। যুদ্ধ থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ইস্তাম্বুলে। 

বেশ সস্তায় একটা গারল্যান্ড কিনে বেঞ্চে রেখে ওদের দিকে তাকিয়ে ধন্যবাদ সূচক একটা হাসি দিলাম। মেয়েটা গারল্যান্ডটা তুলে আমার মাথায় পরিয়ে দিল। আমরা তিনজন একসাথে হেসে উঠলাম। 

হঠাৎ কানের পাশ দিয়ে যাওয়া হুইসেলের তীব্র আওয়াজে চমকে গিয়ে তাকাতেই দেখি, কালো কাপড়ে একজন পুলিশ ছেলেটার ঘাড় ধরে আটকে ফেলেছে। ততক্ষণে মেয়েটা সম্ভবত দৌড়ে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে। ঘাড় ধরে ছেলেটাকে শূন্যে তুলে পুলিশটা প্রিজন ভ্যানের দিকে হাঁটা ধরল। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে খালি পায়েই আমি তার পেছনে ছুটলাম ভ্যানের দিকে। 

বাচ্চাটাকে ভ্যানের ভেতরে ছুড়ে ফেলে সে দ্রুত দরজাটা লাগিয়ে দিল। যা দেখলাম, ভেতরে আরো কয়েকজন শিশু। আমি চিৎকার করে, ভ্যানের দরজায় বাড়ি দিতে দিতে বললাম, ওদের ছেড়ে দাও, ওদের ক্যাম্পে যেতে দাও। একজন পুলিশ জানালা দিয়ে গলা বের করে বেশ কড়া ভাষায় বলল, দূরে গিয়ে নিজের কাজে মন দাও। 

আমি দৌড়ে গিয়ে ভ্যানের সামনে দাঁড়ালাম। বারবার চিৎকার করে বললাম, বাচ্চাদের ছেড়ে দাও। তাতে কোন লাভ হলো না। ভ্যানের দরজা খুলল না। আমি কাঁদতে শুরু করলাম। আমার কান্না দেখে আরেকজন পুলিশের মন হয়তো কিছুটা নরম হলো। সে মাথা বের করে বলল, চিন্তা করো না, আমি দেখছি ব্যাপারটা। তারপরেই আমাকে কাটিয়ে শরীরের একইঞ্চি পাশ দিয়ে ভ্যানটা ছুটে চলল সামনে।

নিরুপায় আমি চিৎকার করতে করতে কিছুক্ষণ দৌড়ালাম ভ্যানটার পিছে। কোন লাভ হলো না তাতে। আমি রাস্তায় বসে কাঁদতে থাকলাম। আমার পাগলামি, ছোটাছুটি দেখে বেশ কয়েকজন জড়ো হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। তাদের একজন খুব করে বুঝালো, বাচ্চাদের কিছুই হবে না, তাদের ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে, আমি যেন কান্না বন্ধ করি।

আমার কান্না বন্ধ হলো না। আমি একজন মা, আমার ছেলে ওদের বয়সী। মনে কেন জানি কুডাক দিচ্ছে বারবার। মনে হচ্ছে, বাচ্চাগুলোর কঠিন বিপদ। কেউ একজন হোটেলের ঠিকানা জেনে নিয়ে ট্যাক্সি ডেকে দিল। কাঁদতে কাঁদতেই হোটেলের রুমে ফিরলাম। তারপর, অনেকক্ষণ আর কান্না বন্ধ হলো না আমার। সারারাত জেগে বাচ্চাদের জন্য প্রার্থনা করলাম। 

পরদিন সকালে যখন ফ্লাইট ধরলাম, তখন মাথায় সেই গারল্যান্ড পরে নিলাম। কাঁটার মুকুট পরে যিশু যেমন ক্রুশে উঠেছিলেন, আমি সেই গারল্যান্ড পরে ফ্লাইটে উঠলাম। 

এরপর পার হয়ে গেল প্রায় দশবছর। আমি বাচ্চাগুলোর অসহায় চেহারা ভুলতে পারিনা। সেগুলো প্রায় চোখের সামনে ভাসে আর নিজের অজান্তেই মনে কেমন একটা ভয় অনুভব করি। মনে-প্রাণে শিশুগুলোর মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করি। 

আজ সন্ধ্যা থেকেই ফেসবুকের ফিডে এপস্টিন ফাইল ইস্যু। দেখলাম মোটা টাকার বিনিময়ে তুর্কি থেকে সিরিয়ান আর কুর্দি শিশুদের পাঠানো হতো এপিস্টিনের সেই অভিশপ্ত দ্বীপে। তারপর, তাদের কী পরিণতি হতো সেটা এখন সবার জানা। এসব, দেখার পরেই সেই অজানা ভয়টা আমার মনে আকড়ে বসেছে। সেদিন যে মনে কুডাক দিল, সেটা কি এরকম কোন বিপদ আঁচ করে? ভাবনাটা আর বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যাই না। মনে মনে বলি, বাচ্চাগুলোর সাথে এরকম কিছুই হয় নি, তারা শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পে ফিরেছিল, মায়ের বুকে ফিরেছিল। 

তারপর, ঘুমানোর চেষ্টা করি, কিন্তু ঘুম আসে না। সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে পালিয়ে তুর্কিতে যাওয়া শিশুদের কথা আবার মাথার মধ্যে হানা দেয়।

সর্বশেষ