রোববার ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

সামছুল আলম সাদ্দাম

প্রকাশিত: ২২:৫২, ১৮ জুলাই ২০২৬

বেলুচিস্তানের রক্তাক্ত বাস্তবতা: কেন আজও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রাসঙ্গিক

বেলুচিস্তানের রক্তাক্ত বাস্তবতা: কেন আজও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রাসঙ্গিক
ছবি: গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু আজও কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন—"পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল?" ইতিহাসের সেই প্রশ্নের উত্তর যেন আজ নতুন করে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে।

ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, দমন-পীড়ন, সম্পদ লুণ্ঠন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আলোচিত। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিকে ঘিরে নানা খবর প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এসব তথ্যের কিছু অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—বেলুচ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করছে।

এই বাস্তবতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

একসময় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষও ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমেছিল। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং দমন-পীড়ন শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি করেছিল।

আজ বেলুচিস্তানের মানুষের অভিযোগেও একই ধরনের বিষয় উঠে আসে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, সেখানে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের অভিযোগ নিয়মিতভাবে সামনে আসছে। অনেক পরিবারের সদস্য বছরের পর বছর নিখোঁজ রয়েছেন। বহু মানুষের দাবি, তাদের প্রিয়জনদের কোনো বিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে।

ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নেও বেলুচদের ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, বেলুচি ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবর্তে উর্দুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক মিল খুঁজে দেয়। ১৯৫২ সালে বাংলার মানুষ মাতৃভাষার অধিকারের জন্য জীবন দিয়েছিল। সেই আত্মত্যাগ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বেলুচিস্তানের অভিযোগ নতুন নয়। তামা, সোনা, গ্যাসসহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক হয়েও অঞ্চলটির বড় অংশ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। সমালোচকদের দাবি, সম্পদের সুফল স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছায় না; বরং কেন্দ্রীয় সরকার ও অন্য অঞ্চল বেশি সুবিধা পায়।

এই চিত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ের অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবদান ছিল ব্যাপক, কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশই পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হয়েছিল। বৈদেশিক সহায়তা, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও একই বৈষম্যের অভিযোগ ছিল।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কোনো জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক অধিকার দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হলে ক্ষোভ একসময় স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নেয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, ভাষার অধিকার, গণতন্ত্র এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ইতিহাস। তাই আজ বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বাংলাদেশের ইতিহাসও অনিবার্যভাবে সামনে চলে আসে।

যারা আজও প্রশ্ন করেন—"বাংলাদেশ কেন স্বাধীন হয়েছিল?"—তাদের জন্য ইতিহাসের বইয়ের পাশাপাশি সমসাময়িক বিশ্বের ঘটনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা নয়; অনেক সময় তা নতুন প্রেক্ষাপটে নিজেকেই পুনরাবৃত্তি করে।

বেলুচিস্তানের বর্তমান সংকট সেই পুনরাবৃত্তিরই একটি আলোচিত উদাহরণ। দুটি ভূখণ্ডের ইতিহাস এক নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতাও আলাদা। কিন্তু বৈষম্য, সাংস্কৃতিক দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে দুটি ইতিহাসের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে।

ইতিহাসের এই সাদৃশ্য আমাদের অন্তত একটি শিক্ষা দেয়—যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেখানে অসন্তোষ একসময় গভীর রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

— সামছুল আলম সাদ্দাম
লেখক ও সাংবাদিক

সর্বশেষ

জনপ্রিয়