বাংলাদেশে হামের পুনরুত্থান
সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা, স্বাস্থ্য অধিকার ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জরুরি বাস্তবতা
বাংলাদেশে ‘হাম’ (Measles)-এর সাম্প্রতিক পুনরুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন জনস্বাস্থ্য সংকেত নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করছে। একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ যখন পুনরায় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল একটি ভাইরাল সংক্রমণ নয়—বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
World Health Organization এবং UNICEF-এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত না হলে কার্যকর herd immunity অর্জন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে সামগ্রিক টিকাদান হার তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক হলেও ‘zero-dose’ ও ‘missed children’—এই দুই শ্রেণির শিশু এখনো স্বাস্থ্যসুরক্ষা বলয়ের বাইরে রয়ে গেছে। এই সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতিই সংক্রমণ পুনরুত্থানের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি সরাসরি সাংবিধানিক ও আইনি মাত্রা লাভ করে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ চিকিৎসাসহ মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করেছে এবং ১৮(১) অনুচ্ছেদ জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই কাঠামোর আলোকে স্বাস্থ্যসেবা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি একটি বিচারযোগ্য ও প্রয়োগযোগ্য সাংবিধানিক অধিকার।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়, বিশেষত BLAST v. Bangladesh, ‘বেঁচে থাকার অধিকার’-এর বিস্তৃত ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিকে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি বা গুরুতর অসুস্থ শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়—বরং এটি মৌলিক অধিকারের সম্ভাব্য লঙ্ঘন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোও একই দায়বদ্ধতাকে জোরদার করে। Universal Declaration of Human Rights-এর ২৫ অনুচ্ছেদ, International Covenant on Economic, Social and Cultural Rights-এর ১২ অনুচ্ছেদ এবং Convention on the Rights of the Child-এর ২৪ অনুচ্ছেদ—সবগুলোই রাষ্ট্রকে নাগরিকদের ‘সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য স্বাস্থ্যমান’ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও হামকে অবমূল্যায়নের সুযোগ নেই। The Lancet-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, হাম ভাইরাস শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ‘immune amnesia’ সৃষ্টি করে, যা তাদের পূর্ববর্তী প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয় এবং পরবর্তী সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। ফলে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিসসহ জটিলতা মোকাবিলায় বিশেষায়িত পেডিয়াট্রিক চিকিৎসা ও ICU সাপোর্ট অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু বাস্তবতা উদ্বেগজনক। দেশের অধিকাংশ জেলা ও আঞ্চলিক হাসপাতালে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ICU সুবিধা নেই, সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞের ঘাটতি প্রকট, এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থায় কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। এর ফলে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ জীবনঘাতী ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে—যা কার্যত একটি প্রতিরোধযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।
এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এআই-নির্ভর রোগ নজরদারি ব্যবস্থা, real-time টিকাদান রেজিস্ট্রি এবং উন্মুক্ত স্বাস্থ্য ড্যাশবোর্ড জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান AI-চালিত তথ্যব্যবস্থায় (যেমন SGE), তথ্যের নির্ভুলতা, উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণই নীতিনির্ধারণী আলোচনায় প্রাধান্য পায়।
অতএব, হাম প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কৌশল গ্রহণ অপরিহার্য। প্রথমত, শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করে zero-dose শিশুদের সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের জন্য ICU ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ জরুরি। তৃতীয়ত, সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও শিশু চিকিৎসকদের বিকেন্দ্রীভূত নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, স্বাস্থ্যখাতে একটি কার্যকর accountability framework প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ—এটি আমাদের জানা। কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হওয়া একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।
প্রশ্নটি এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সীমা অতিক্রম করেছে; এটি ন্যায্যতা, অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
মোঃ শামীউল আলীম শাওন, লেখক, উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ - ইয়্যাস (Youth Action for Social Change)



























