শনিবার ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৩৮, ৪ জুলাই ২০২৬

৭১’র দায় থেকে জামায়াতকে মুক্তি দিতে চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার

৭১’র দায় থেকে জামায়াতকে মুক্তি দিতে চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার
ছবি: সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা থেকে এই যুদ্ধের বিরোধিতাকারী হিসেবে চিহ্নিত জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের নাম বাদ দিতে চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলকে (জামুকা) না জানিয়েই পাঠ্যপুস্তকে মুদ্রিত সংজ্ঞায় আনা হয়েছিল পরিবর্তন। এ বিষয়ে অনুমোদন নিতে জামুকার সভায় তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ও সংস্থাটির চেয়ারম্যান ফারুক-ই-আজম উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে এমন প্রস্তাব উত্থাপন করলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন জামুকার সদস্যরা।

তারা সাফ জানিয়ে দেন— মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং আলবদর, রাজাকার ও আলশামস বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এটিই সত্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত ইতিহাস। জামুকা সদস্যরা এ ইতিহাসের বিকৃতি করতে পারেন না। আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

জানা গেছে, ওই সময় জামুকা সদস্যদের তীব্র আপত্তি ও প্রতিবাদের মুখে উপদেষ্টা পরিষদের প্রস্তাবটি নাকচ হলে সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞায় রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম নামের আগে ‘তৎকালীন’ শব্দ যোগ হবে। সেভাবেই তখন প্রস্তাবিত ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত হয়। সেই অধ্যাদেশটিই গত ১০ এপ্রিল ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ বিল আকারে জাতীয় সংসদে পাস হয়।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া এমন প্রচেষ্টার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন জামুকার তৎকালীন সদস্য ও জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত। আগামীর সময়কে তিনি জানালেন, অন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে না পারায় বিব্রত হন উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম। জামুকা সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার কারণেই তিনি এটা করতে পারেননি।

অনুসন্ধানে জানা গেল, গত বছর ১০ মে হয় জামুকার ৯৬তম সভা। যাতে সভাপতিত্ব করেন সাবেক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম। উপস্থিত ছিলেন জামুকার সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান (বীরউত্তম), ক্যাপ্টেন (অব.) এম নুরুল হুদা, মেজর (অব.) সৈয়দ মুনিবুর রহমান, মেজর (অব.) কাইয়ুম খান, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাদেক আহমেদ খান, হাবিবুল আলম, খ. ম. আমীর আলী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সচিব ইসরাত চৌধুরী ও জামুকা মহাপরিচালক শাহিনা খাতুন।

মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা থেকে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব রেখে বৈঠকে ফারুক-ই-আজম বলেন, ‘গত ৬ মে উপদেষ্টা পরিষদ সভায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২২ সংশোধনকল্পে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। সভায় জানানো হয়, পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রকাশিত পাঠ্যপুস্তকে এ-সংক্রান্ত রচনায় সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধনীগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের একটি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ওই সংজ্ঞার সঙ্গে মিল রেখে সর্বজনীন মুক্তিযুদ্ধ/মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ-এর ২(১১) এবং ২/১৩) উপধারায় ‘মুজাহিদ বাহিনী, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম’ শব্দগুলো বাদ দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

ফারুক-ই-আজম আরও বলেন, ‘উপদেষ্টা পরিষদের সভার পরামর্শমতে সংশোধন বা পরিমার্জনের লক্ষ্যে কাউন্সিলের সদস্যদের মতামতের জন্য উপস্থাপন করা হলো।’ সঙ্গে সঙ্গে সভায় উপস্থিত জামুকার সদস্যরা তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান। সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান বীরউত্তম তখন বলেন, ‘আমরা সবাই জানি কাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, আলবদর, আলশামস— এদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন, এটিই সত্য ইতিহাস।’

জামুকাকে না জানিয়ে পাঠ্যপুস্তকের রচনায় কীভাবে সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হলো, সে প্রশ্ন তুলে তীব্র অসন্তোষ জানিয়ে অন্য সদস্য মেজর (অব.) কাইয়ুম খান মন্তব্য করেন, পাঠ্যপুস্তকে কী সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার যেকোনো সংজ্ঞা একমাত্র জামুকাই দেবে।

উপদেষ্টা পরিষদের এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানকারী আরেক সদস্য মেজর (অব.) সৈয়দ মুনিবুর রহমানের ভাষ্য, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করতে পারি না। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, দালাল শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। এটি সুপ্রতিষ্ঠিত।’

সদস্য হাবিবুল আলম বলেন, বিদ্যমান জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২২-এ ‘মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম’ শব্দগুলো আছে। এগুলো যথার্থভাবেই আইন/আদেশ/প্রজ্ঞাপনে সন্নিবেশিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসও তাই। এ ছাড়া বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮-এর ২(১১) ও ২(১৪) নম্বর ধারায় যথাক্রমে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় জামায়াতে ইসলামীর কথা বর্ণিত আছে। ওই শব্দগুলো প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে বাদ দেওয়া সমীচীন হবে না।

এ সময় উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞাসহ প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং নেজামে ইসলামের আগে ‘তৎকালীন’ শব্দ যোগ করার প্রস্তাব করা যায় কি না, তা জানতে চাইলে সভায় উপস্থিত সদস্যরা তাতে একমত পোষণ করেন।

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের আগের আইনে মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞায় বলা হয়েছিল, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়া দখলদার ও হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম ও মুসলিম লীগ এবং তাহাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুজাহিদ বাহিনী ও পিস কমিটির বিরুদ্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধ।’ এর পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বাদ দিয়ে সংজ্ঞায় বলা হয়— ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।’

গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয়। পরে এগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে এর মধ্য থেকে ৯৮টি অধ্যাদেশ সংসদে হুবহু বিল আকারে তোলার জন্য করা হয় সুপারিশ।

সূত্র: আগামীর সময়

সর্বশেষ

জনপ্রিয়