সাতক্ষীরায় শিশু হত্যার মামলায় সন্তানহারা পরিবারের সংবাদ সম্মেলন
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে ৯ বছরের শিশু ফারজানা খানমকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সুমাইয়া গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার পর দায়ের করা মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছে ফারজানার পরিবার। একই সঙ্গে শিশু হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
রবিবার দুপুরে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন নিহত শিশু ফারজানার মা নাজমা খাতুন। তিনি ফারজানার পরিবার ও স্থানীয় নিরপরাধ লোকজনকে হত্যা মামলায় জড়ানোর প্রতিবাদ জানান এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেন।
লিখিত বক্তব্যে নাজমা খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী এনামুল হক পেশায় শ্রমিক। তাঁদের মেয়ে ফারজানা খানম কালিগঞ্জের কাজলা কাশিবাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ২০ জুলাই সকালে প্রতিদিনের মতো স্কুলে যায় ফারজানা। দুপুরে টিফিনের পর বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা স্কুলে গিয়ে খোঁজ নেন। সেখানে শ্রেণিকক্ষে তার বই ও ব্যাগ পড়ে থাকলেও ফারজানাকে পাওয়া যায়নি।
নাজমার অভিযোগ, দীর্ঘ সময় শিশুটি বিদ্যালয়ে না থাকলেও বিষয়টি পরিবারকে জানানো হয়নি। এ ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবহেলার অভিযোগও করেন তিনি।
তিনি জানান, পরে সহপাঠীদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, ফারজানা পাশের সুমাইয়া নামের এক নারীর দোকানে ঝালমুড়ি কিনতে গিয়েছিল। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনরা সুমাইয়ার কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তাঁর আচরণ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুমাইয়ার ঘরের একটি ড্রয়ার থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফারজানার মরদেহ উদ্ধার করে।
নাজমা খাতুনের দাবি, ফারজানার কানের স্বর্ণের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। মরদেহ উদ্ধারের পর উত্তেজিত জনতা সুমাইয়াকে গণপিটুনি দেয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন নাজমা।
তিনি বলেন, সন্তান হারানোর শোক এবং তাঁর স্বামীর অসুস্থতার কারণে ওই সময় পরিবারের সদস্যদের পক্ষে উত্তেজিত জনতাকে ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
ফারজানার বাবা এনামুল হক বাদী হয়ে সুমাইয়ার ভাই আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে কালিগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় আবদুল্লাহ আল মামুন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
অন্যদিকে সুমাইয়ার স্বামী আমিরুল ইসলাম ও তাঁর বাবা আবদুল লতিফ পৃথক দুটি মামলা করেছেন বলে জানান নাজমা খাতুন। তাঁর দাবি, আবদুল লতিফের করা মামলায় ফারজানার পরিবারের দুই সদস্যসহ আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
নাজমা খাতুন অভিযোগ করেন, সন্তানহারা পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেই এখন হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনার সময় এলাকায় উপস্থিত ছিলেন না বা ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না—এমন ব্যক্তিদেরও অজ্ঞাত আসামি করে হয়রানি ও আটকের অভিযোগ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
কাঁদতে কাঁদতে নাজমা খাতুন বলেন, “আমার নিষ্পাপ সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। এখন আবার আমার স্বামীসহ স্বজনদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। সন্তান হারানোর শোক সামলাব, নাকি মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াব? এটা কেমন বিচার?”
সংবাদ সম্মেলনে শিশু ফারজানা হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ও সন্তানহারা পরিবার যাতে হয়রানির শিকার না হয়—এ জন্য সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

























