বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

কুবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০০:১১, ২৩ জুলাই ২০২৬

৫৭টি বিভাগীয় চুড়ান্ত ফলাফলে ৪৪টিতেই প্রথম কুবির ছাত্রীরা 

৫৭টি বিভাগীয় চুড়ান্ত ফলাফলে ৪৪টিতেই প্রথম কুবির ছাত্রীরা 
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষার বিভাগীয় চূড়ান্ত ফলাফলে টানা তিন শিক্ষাবর্ষ ধরে ছাত্রদের তুলনায় এগিয়ে ছাত্রীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি বিভাগের সর্বশেষ তিন শিক্ষাবর্ষের ৫৭টি বিভাগীয় চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণে ৪৪ টিতেই ছাত্রীরা প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।  

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ১৯ টি বিভাগের মোট ৫৭টি বিভাগীয় চূড়ান্ত ফলাফলের মধ্যে ৪৪ টিতেই ছাত্রীরা এবং ১৩ টিতে ছাত্ররা বিভাগীয় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। অর্থাৎ মোট ফলাফলের প্রায় ৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান অর্জন করেছেন ছাত্রীরা, বিপরীতে ছাত্রদের দখলে রয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।

 এছাড়া, ১৯টি বিভাগের মধ্যে ১৪-১৬ টি বিভাগে অন্তত দুই বা ততোধিক শিক্ষাবর্ষে বিভাগীয় প্রথম হয়েছেন ছাত্রীরা। অন্যদিকে মাত্র ৩-৫ টি বিভাগে ছাত্ররা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছেন। ফলে সামগ্রিক ফলাফলে ছাত্রীরাই স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৭–১৮ শিক্ষাবর্ষে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (এআইএস), ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, ফার্মেসি, অর্থনীতি, আইন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, রসায়ন, নৃবিজ্ঞান, বাংলা, আইসিটি, সিএসই, মার্কেটিং ও ইংরেজি বিভাগে ছাত্রীরা বিভাগীয় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। অন্যদিকে গনিত, লোকপ্রশাসন, পরিসংখ্যান, প্রত্নতত্ত্ব ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ছাত্ররা প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।

২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (এআইএস), ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, লোকপ্রশাসন, ফার্মেসি, অর্থনীতি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, পদার্থবিজ্ঞান, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, প্রত্নতত্ত্ব, রসায়ন, পরিসংখ্যান, বাংলা, নৃবিজ্ঞান, আইসিটি, সিএসই ও মার্কেটিং বিভাগে ছাত্রীরা বিভাগীয় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। অন্যদিকে ইংরেজি, গণিত, আইন বিভাগে ছাত্ররা এগিয়ে রয়েছেন।

২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষে ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, লোকপ্রশাসন, ফার্মেসি, অর্থনীতি, আইন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, প্রত্নতত্ত্ব, রসায়ন, পরিসংখ্যান, বাংলা, ইংরেজি , আইসিটি, সিএসই ও মার্কেটিং বিভাগে ছাত্রীরা বিভাগীয় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। অন্যদিকে গনিত,পদার্থবিজ্ঞান, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, নৃবিজ্ঞান এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (এআইএস) বিভাগে ছাত্ররা প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।

ছাত্রীদের সাফল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মনে করছেন, ধারাবাহিকভাবে ফলাফলে ছাত্রীরা এগিয়ে থাকার পেছনে সামাজিক, পারিবারিক ও একাডেমিক নানা কারণ কাজ করছে। তাদের মতে, ক্যারিয়ার সচেতনতা, নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং পড়াশোনায় বেশি সময় দেওয়ার প্রবণতা ছাত্রদের তুলনায় অনেক ছাত্রীর মধ্যে বেশি দেখা যায়। এই ব্যবধান কমাতে ছাত্রদের নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ, পড়াশোনায় অধিক মনোযোগ এবং একাডেমিক পরিবেশে আরও সক্রিয় হওয়ার বিকল্প নেই।

ইংরেজি বিভাগের ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো: মাকসুদ নুরের মতে,' ছাত্রদের একাডেমিক ফলাফলে সময় ব্যবস্থাপনা, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্বের চাপ এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপনের অভ্যাস প্রভাব ফেলতে পারে। 

তিনি বলেন, “অনেক পরিবারে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় ছেলেদের ওপর দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চাপ থাকে। ফলে তারা একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির প্রস্তুতিতেও সময় দেয়, যার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে একাডেমিক ফলাফলে পড়ে। তবে অন্যদিকে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণির বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে অনেক ছেলেই নির্বাচিত হচ্ছে। যেমন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪৭তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে অধিকাংশই ছেলে।”

অন্যদিকে লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তারের মতে, 'মেয়েদের ক্রমবর্ধমান ক্যারিয়ার সচেতনতা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে বাড়তি উপলব্ধিই তাদের একাডেমিক সাফল্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।'

তিনি বলেন, “বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পড়াশোনার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মেয়েদের উপস্থিতি বেশি। এর অন্যতম কারণ হলো, তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্যারিয়ার সচেতন। মেয়েরাও চায় তাদের নিজস্ব একটি আয়ের উৎস থাকুক। এছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে তারা ছেলেদের তুলনায় ঘরে বেশি সময় কাটায়, ফলে পড়াশোনায়ও বেশি সময় দিতে পারে। অন্যদিকে, বর্তমান সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রবণতা বেড়েছে। তাই অনেক মেয়েই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্বাবলম্বী হতে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে পড়াশোনায় আরও গুরুত্ব দিচ্ছে।”


গণিত বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষে বিভাগীয় প্রথম হওয়া শিক্ষার্থী জিশু দত্ত ছাত্রদের তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে বলেন, 'একাডেমিক ফলাফলে ছেলেদের তুলনামূলক পিছিয়ে থাকার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। অনেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি, খণ্ডকালীন কাজ বা পারিবারিক দায়িত্ব পালন করায় নিয়মিত পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না। এছাড়া, চাকরি বা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনের প্রস্তুতি এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে বেশি সম্পৃক্ততাও একাডেমিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।অন্যদিকে, অনেক মেয়ে নিয়মিত ক্লাস, নোট তৈরি, অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অধিক ধারাবাহিক হওয়ায় তুলনামূলক ভালো ফল করে।'

 তিনি আরও বলেন,' অনেক ছেলে অসাধারণ একাডেমিক ফলাফল করে, আবার অনেক মেয়েও বিভিন্ন কারণে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারে না। সুতরাং,  একাডেমিক সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো অধ্যবসায়, নিয়মিত অনুশীলন এবং সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা। যে শিক্ষার্থী যত বেশি আন্তরিকতা ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে পড়াশোনা করবে, তার ভালো ফল করার সম্ভাবনাও তত বেশি।'

মেধাস্থানে ছাত্রদের পিছিয়ে পড়ার কারণ নিয়ে গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আবদুল্লাহ আল মাহবুব বলেন, “ছাত্রদের ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রত্যাশা ও আর্থিক দায়িত্ব তুলনামূলক বেশি থাকে। এ কারণে অনেককেই টিউশনি করতে হয়, যা তাদের পড়াশোনার সময় কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি অনেক ছাত্র নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে না বা পড়াশোনায় পর্যাপ্ত মনোযোগী হয় না। নিজেদের একাডেমিকভাবে সেরা হওয়ার মানসিকতাও অনেকের মধ্যে ততটা দেখা যায় না।”

ছাত্রীদের এগিয়ে থাকা এবং ছাত্রদের পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন বলেন, “ভালো ফলাফলের জন্য পড়াশোনায় গভীর মনোযোগ ও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন। অনেক ছাত্র টিউশনি, পারিবারিক দায়িত্ব ও আর্থিক চাপের কারণে পড়াশোনায় প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারে না। অন্যদিকে, অনেক ছাত্রী তুলনামূলকভাবে এসব চাপ কম থাকায় পড়াশোনায় বেশি সময় দিতে সক্ষম হয়। এছাড়া বর্তমানে শ্রেণিকক্ষে ছাত্রীদের উপস্থিতি ও অনুপাতও ছাত্রদের তুলনায় বেশি।”

সর্বশেষ

জনপ্রিয়