২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা: ২১ বছর পর কোথায় দাঁড়ালো বিচার?
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে যে গ্রেনেড হামলা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশ, সেই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায়ও যোগ হয়েছে বাঁক বদলের ইতিহাস। ঘটনার বিকাল থেকে শুরু করে তদন্তের ভিন্নতা, অভিযোগপত্র বদল, আসামির সংখ্যা বৃদ্ধি, ২০১৮ সালে ৪৯ জনের দণ্ড, ছয় বছর পর হাইকোর্টে সবার খালাস এবং শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগেও সেই খালাস বহাল— দুই দশকের বেশি সময় ধরে মামলাটি পেরিয়েছে একের পর এক নাটকীয় মোড়।
মামলার বিবরণী অনুসারে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়। একের পর এক বিস্ফোরণে ঘটনাস্থল পরিণত হয় রক্তাক্ত। নিহত হন ২৪ জন। আহত হন কয়েকশ মানুষ। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন এবং অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
এই হামলার পর মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা হয়। কিন্তু মামলা হওয়ার পর থেকেই তদন্তের গতিপথ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়। এক পর্যায়ে তদন্ত নতুন করে শুরু হয় এবং মামলাটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক সহিংসতার মামলাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
তদন্তের পথ বদল, বাড়তে থাকে আসামি
২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সিআইডি নতুন করে তদন্ত শুরু করে। ২০০৮ সালে ২২ জনকে আসামি করে দুটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
অধস্তন আদালতের দণ্ডাদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা
দীর্ঘ বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। দুই মামলায় ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু। যাবজ্জীবনপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমান।
বিচারিক আদালতের রায়ে ২১ আগস্টের হামলাকে একটি পরিকল্পিত ও সংগঠিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। মামলার তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়া এবং হামলাকারীদের সহযোগিতার অভিযোগেও কয়েকজন সাবেক পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে সাজা দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের রায়ে সব আসামি খালাস
বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলা যায় হাইকোর্টে। এদিক আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারেরও পতন ঘটে। পরবর্তীকালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে ডেথ রেফারেন্স এবং দণ্ডিতদের আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শুরু হয় হাইকোর্টে। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর আসে মামলার দ্বিতীয় বড় মোড়। হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে সব আসামিকে খালাস দেন।
হাইকোর্টের রায়ে শুধু আসামিদের বিরুদ্ধে প্রমাণের প্রশ্নই নয়, মামলার তদন্ত ও সম্পূরক অভিযোগপত্রের আইনগত ভিত্তি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়। বিশেষ করে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত বিচারিক কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়েও খালাসের রায় বহাল
হাইকোর্টের রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট হয়নি। ২০২৫ সালের মার্চে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে লিভ টু আপিলের আবেদন করে। পরে আপিল বিভাগ সেই আবেদন গ্রহণ করে শুনানির পথ খুলে দেন। শুরু হয় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ২১ আগস্ট মামলার আরেক দফা বিচারিক লড়াই। দীর্ঘ শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায়ের জন্য ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় সদস্যের বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে দেন। ফলে হাইকোর্টের দেওয়া খালাসের রায় বহাল থাকে।
এর মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালের বিচারিক আদালতের দণ্ড আর কার্যকর থাকলো না। অর্থাৎ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১৯ জনের যাবজ্জীবনসহ অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা— সবই উচ্চ আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তে বাতিল হয়ে যায়। তবে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় পুরোপুরি অপরিবর্তিত রাখেননি। কিছু পর্যবেক্ষণ সংশোধন ও কিছু অংশ প্রত্যাহার করেন।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
আপিল বিভাগের রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা। আদালত বিশেষ করে মামলার অন্যতম আসামি মুফতি আবদুল হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি কী পরিস্থিতিতে নেওয়া হয়েছিল, সেটি বিবেচনা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে জবানবন্দিগুলো স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহের বিষয় উঠে আসে। ফৌজদারি মামলায় কোনও স্বীকারোক্তি পাওয়া গেলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ হয়ে যায় না। সেটি কীভাবে নেওয়া হয়েছে, স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কিনা এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য রয়েছে কিনা— এসব বিষয়ও আদালতের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ২১ আগস্ট মামলায় এই প্রশ্নটিই শেষ পর্যন্ত মামলার প্রমাণমূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে ওঠে।
এদিকে হাইকোর্টের রায়ে ২১ আগস্ট হামলার স্বাধীন ও সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ ছিল। কিন্তু আপিল বিভাগ সেই পর্যবেক্ষণ বহাল রাখেননি—বরং তা প্রত্যাহার বা এক্সপাঞ্জ করেছেন। তাই আপিল বিভাগের রায়কে কেন্দ্র করে মামলার নতুন তদন্তের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী এসএম শাহজাহান বলেন, ‘‘মামলাটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তদন্তে হস্তক্ষেপের বিষয় উঠে এসেছে। কোনও প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না। এ মামলায় অনেক রাজনৈতিক ফ্লেভার মেশানো ছিল। রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে যে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না, এই মামলাই তার প্রমাণ।’’
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন



























