সোমবার ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:১৩, ২৮ জুন ২০২৬

জনকণ্ঠকে ঘিরে নানা অভিযোগের চিত্র তুলে ধরলেন শামীমা

জনকণ্ঠকে ঘিরে নানা অভিযোগের চিত্র তুলে ধরলেন শামীমা
ছবি: সংগৃহীত

দেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে দৈনিক জনকণ্ঠ একটি সুপরিচিত, ঐতিহ্যবাহী এবং মাইলফলক সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী এই গণমাধ্যম সাহসী, অনুসন্ধানী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে পাঠকসমাজে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে।

রোববার (২৮ জুন) সকালে জনকণ্ঠের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে শামীমা আতিকুল্লাহ খান এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জনকণ্ঠের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক-প্রকাশক আতিকুল্লাহ খান মাসুদের মৃত্যুর পর তিনি সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তবে এই পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। বিভিন্ন সময় নানামুখী চাপ, হামলা, হুমকি ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েও জনকণ্ঠ জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্র এবং মুক্তচিন্তার পক্ষে তার সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।

শামীমা আতিকুল্লাহ খান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে যে মব সংস্কৃতি, দখলদারিত্ব এবং আইনহীনতার প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তার সবচেয়ে নৃশংস এবং ভয়াবহ রূপটি প্রত্যক্ষ করেছে দেশের সংবাদপত্র জগতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান দৈনিক জনকণ্ঠ।

তার দাবি, একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমকে কীভাবে ভেতরের এবং বাইরের একটি উগ্র, স্বার্থান্বেষী ও দুষ্কৃতকারী চক্র সম্পূর্ণ জিম্মি করে দেশের প্রচলিত আইন না মেনে দিন-দুপুরের ডাকাত দলের মতো তাণ্ডব চালিয়ে ধ্বংসের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে, তার এক লোমহর্ষক ও শিউরে ওঠার মতো চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে তারা মালিকপক্ষকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, অননুমোদিত সম্পাদকীয় কমিটি গঠন, বিভিন্ন পদে অবৈধ নিয়োগ এবং প্রিন্ট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভুল ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে তারা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং জনকণ্ঠের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালায়। দখলদারিত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি তারা বেতন ও অন্যান্য আর্থিক বিষয়ে মালিকপক্ষের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। দখল-পরবর্তী সময়ে নজিরবিহীন অরাজকতা, দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়মিত উপস্থিতি এবং কর্মপরিবেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, বিজ্ঞাপন বিভাগের অসাধুচক্রের চরম নিষ্ক্রিয়তা এবং স্পন্সরদের ভয়-ভীতি দেখানোর ফলে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিমাসে কোটি টাকার উপরে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে থাকে।

সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল। শামীমা আতিকুল্লাহ খানের দাবি, ওই চক্রটি তার ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং অফিসিয়াল লেটারহেড জাল করে অনলাইনে একটি ভুয়া প্রজ্ঞাপন জারি করে যে, "দৈনিক জনকণ্ঠ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে"। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই একটি মাত্র জালিয়াতির মাধ্যমে পত্রিকার বাজার, বিজ্ঞাপনদাতা এবং কোটি কোটি পাঠকের আস্থা এক রাতে ধূলিস্যাৎ করে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ, অর্থ লুটপাট, চরম জালিয়াতি, কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি আসার পরেও তিনি সম্পূর্ণ মানবিক এবং আইনি অবস্থান বজায় রেখেছেন। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে হাতের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে জনকণ্ঠকে টিকিয়ে রাখা, আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে তিনি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

সেই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১৫১ জন সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অব্যাহতি প্রদান করা হয় বলে জানান তিনি। তার দাবি, তাদের প্রত্যেককে প্রাপ্য বকেয়া বেতন, উৎসব ভাতা এবং চার মাসের টার্মিনেশন বেনিফিটসহ আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি পত্র প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের অন্যান্য সব আর্থিক পাওনাও পরিশোধ করা হবে।

তিনি আরও জানান, নিরীক্ষা (অডিট) সম্পন্ন হওয়ার পর ১৬ জন সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে তাদের প্রাপ্য অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে প্রদান করা হয়েছে। অবশিষ্টদের অন্যান্য দেনা-পাওনাও দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হবে।

শামীমা আতিকুল্লাহ খান বলেন, এতকিছুর পরও একটি কুচক্রী মহল এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। পুনর্বহালের দাবিতে অযাচিত কার্যকলাপে লিপ্ত হচ্ছে এবং জনসাধারণের কাছে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে যে, অব্যাহতি পাওয়া কর্মীদের কোনো প্রকার আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়নি। তার দাবি, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, অসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তিনি বলেন, দৈনিক জনকণ্ঠ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। শ্রম আইন মেনে, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে, নীতিমালা ও আর্থিক সক্ষমতার আলোকে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে কিংবা কাকে অব্যাহতি দেওয়া হবে, তা সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়। এ ধরনের সিদ্ধান্তে অযাচিত তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।

নির্বাচিত সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনকণ্ঠসহ দেশের সব গণমাধ্যম যেন স্বাধীনভাবে, নির্ভয়ে এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাদের সংবাদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক।

একই সঙ্গে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই কঠিন সময়ে সবাই জনকণ্ঠের পাশে থাকুন। আপনাদের সহযোগিতা, সমর্থন ও আস্থাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দৈনিক জনকণ্ঠ আবারও একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম হিসেবে দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয়