বৃহস্পতিবার ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩ মাঘ ১৪৩২

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৪৭, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা

চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যস্ততা যেন হঠাৎ থেমে গেছে। যেখানে দিন-রাত ট্রাকের সারি, ক্রেনের শব্দ আর জাহাজের আনাগোনা ছিল নিত্যদিনের চিত্র, সেখানে এখন নিস্তব্ধতা। দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বন্দরটি শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনে বন্দরজুড়ে নেমে এসেছে ভূতুড়ে নীরবতা।

গতকাল বুধবার সকালে বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, মানুষের আনাগোনা নেই, পণ্য ওঠানো-নামানোর যন্ত্রপাতি অলস পড়ে আছে, আর জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো যেন স্থবির হয়ে আছে। জেটিতে থাকা ১৪টি জাহাজ পণ্য খালাস করতে না পেরে আটকা পড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে ২৪ ঘণ্টা সচল থাকা জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও এনসিটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার থেকে নতুন কোনো জাহাজ জেটিতে ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। এমনকি বহির্নোঙরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত জাহাজগুলোও বন্দর ত্যাগ করতে পারেনি। আন্দোলনকারীরা বন্দরের প্রতিটি প্রবেশপথে অবস্থান নেওয়ায় কোনো শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। ফলে জেটি থেকে ইয়ার্ড—সব জায়গায় জনমানবহীন পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে বন্দরের ৪ নম্বর গেটের সামনে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যবাহী লরি ও ট্রেইলারের দীর্ঘ সারি থাকলেও গতকাল গেটের দুই পাশ ছিল তালাবদ্ধ। মাঝে মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের জন্য ছোট দরজা খোলা হলেও পণ্যবাহী কোনো যানবাহনের দেখা মেলেনি। গতকাল পর্যন্ত জেটি ও বহির্নোঙরে মোট ১৪২টি জাহাজ আটকা পড়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাহাজে রয়েছে চিনি, ভোজ্যতেল ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। আমদানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বাজারে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে রমজান মাস সামনে রেখে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে।

বেসরকারি ডিপোগুলোতে গতকাল পর্যন্ত ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস রপ্তানি কনটেইনার আটকা ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি জাহাজগুলো যদি পণ্য না নিয়েই বন্দর ত্যাগ করতে শুরু করে, তাহলে তৈরি পোশাক খাতের শত শত কোটি টাকার ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার টিইইউস কনটেইনার খালাস হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। কিন্তু কর্মবিরতির পর এই হার দ্রুত কমেছে। গত শনিবার কনটেইনার খালাস কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৭৫০ টিইইউসে, রোববার ও সোমবার তা আরও কমে যথাক্রমে এক হাজার ৬৮৪ এবং এক হাজার ২৩০ টিইইউসে। গতকাল বন্দরে মোট কনটেইনার ছিল ৩৭ হাজার ৩১২ টিইইউস।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দেশের রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় উৎস। প্রতিদিন গড়ে বন্দরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকে ১৭০ কোটি টাকা। কর্মবিরতির কারণে দৈনিক রাজস্ব আদায়ের হার প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

বন্দরের ধারণক্ষমতা যেখানে প্রায় ৫৯ হাজার কনটেইনার, সেখানে বর্তমানে জেটি, টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে আটকা পড়েছে ৫২ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কনটেইনার। বহির্নোঙর ও জেটি মিলিয়ে ১৪২টি জাহাজ অলস বসে আছে। প্রধান তিনটি টার্মিনালের জেটিতে ১৪টি জাহাজ গত মঙ্গলবার থেকে নড়তে পারেনি।

বেসরকারি ডিপো বা অফডকগুলো থেকে সাধারণত প্রতিদিন দুই হাজার ৮০০টি রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে পাঠানো হলেও বর্তমানে তা নেমেছে এক হাজার ৪০০টিতে। ২১টি বেসরকারি ডিপোতে বর্তমানে ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস রপ্তানি পণ্য এবং সাত হাজার ৯১০ টিইইউস আমদানি পণ্য আটকা রয়েছে। সবচেয়ে বড় জট তৈরি হয়েছে খালি কনটেইনারে, যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৪৯৬টিতে।

ডিপো মালিক সমিতির (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, ‘টানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ফলে সংকট বাড়ছে। সময়মতো রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে না পারলে বিদেশি জাহাজ পণ্য না নিয়েই বন্দর ছাড়তে পারে, যা তৈরি পোশাক শিল্পে বড় সংকট সৃষ্টি করবে।’

অন্যদিকে আন্দোলনের মুখে বন্দর কর্তৃপক্ষ ৩১ শ্রমিক-কর্মচারীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করেছে। তবে এতে আন্দোলন কমার বদলে আরও তীব্র হয়েছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এনসিটি ইজারা বাতিল ও বদলি করা কর্মচারীদের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত এই টার্মিনালগুলো এভাবেই জনশূন্য থাকবে।’

শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে বসে এই সংকট দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ আন্দোলন আরো দীর্ঘ হলে দেশের অর্থনীতিতে তা আরো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।

সূত্র: কালের কণ্ঠ