আইনজীবীদের ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ বললেন আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, একজন ভালো আইনজীবী হওয়ার জন্য শ্রম, অধ্যবসায় ও নিয়মিত পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। শর্টকাট পথে অর্থবিত্ত অর্জন করা সম্ভব হলেও তাতে একজন ভালো আইনজীবী হওয়া যায় না।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ ফেস্টে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আইন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আজ এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘একজন ধনী ল’ইয়ার হওয়ার শর্টকাট পথ আছে, সেটি হলো ফিক্সিং অ্যান্ড ফক্সিং। কিন্তু ভালো ল’ইয়ার হতে গেলে পড়ালেখার বিকল্প কোনো পথ নেই।’
আইনজীবীদের ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজ নানা ধরনের ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। আইনজীবীরা আইনগত দিকনির্দেশনা দিয়ে সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন। তাই একজন আইনজীবীর প্রতিটি বক্তব্য ও শব্দচয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনমন্ত্রী বলেন, একজন চিকিৎসক রোগী দেখার সময় মূলত তার নিজের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে চিকিৎসা দেন। কিন্তু একজন আইনজীবী যখন আদালতে দাঁড়ান, তখন তাকে বিচারক, বিপক্ষের আইনজীবী, নিজের মক্কেল এবং আদালতে উপস্থিত সংশ্লিষ্ট সবার বিষয় বিবেচনায় রেখে বক্তব্য দিতে হয়। সঠিকভাবে আইন উপস্থাপন, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং মামলার বিষয়গুলো যথাযথভাবে আদালতের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব একজন আইনজীবীর।
তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে একদিন আদালতে দাঁড়িয়ে ‘মাই লর্ড’ বলে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
আইনজীবীদের পেশাগত জীবনের বিভিন্ন ধাপের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, শুরুতে অনেক আইনজীবীকেই কোনো আয় ছাড়াই দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। পরে ধীরে ধীরে কাজ ও আয় বাড়ে। এক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার কারণে এমন অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব হয়, যখন আইনজীবীর উপস্থিতিই তার পেশাগত সাফল্যের বড় ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
নিজের পেশাগত জীবনের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ কর মামলায় তার সিনিয়রের নির্দেশে তিনি দীর্ঘদিন আদালতের যুক্তিতর্কের নোট নিয়েছিলেন। পরে তার সিনিয়র আইনজীবী আদালতে বড় কোনো বক্তব্য না দিয়েও মামলার শুনানিতে অংশ নেন। মামলায় জয় পাওয়ার পর ওই সিনিয়র আইনজীবী বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক পান। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, দীর্ঘদিনের অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতা একজন আইনজীবীর পেশাগত মূল্য তৈরি করে।
দেশে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী থাকলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইন্টার্নশিপ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের নির্বাচন করা হচ্ছে। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ না রেখে মেধাক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে আইন পেশায় দক্ষ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, একজন আইনজীবী একই সঙ্গে তার মক্কেলের প্রতি দায়িত্বশীল এবং আদালতের একজন কর্মকর্তা। মক্কেল তার বিপদের সময়ে আইনজীবীর ওপর আস্থা রেখে নিজের বিষয় তুলে দেন। তাই মক্কেলের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করাও আইনজীবীর দায়িত্ব।
তিনি বলেন, ‘টাকাই সবকিছু নয়। একজন আইনজীবীর উচিত তার সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনে বিনা পারিশ্রমিকে মামলা পরিচালনা করা।’
নিজের পেশাগত জীবনের আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক অসহায় ভূমিহীন নারীর জমি-সংক্রান্ত মামলা তিনি কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই পরিচালনা করেছিলেন। পরে ওই নারী তার সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য অর্থ পারিশ্রমিক হিসেবে দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেন এবং সেই অর্থই তার মেয়ের পরীক্ষার খরচ হিসেবে তাকে ফিরিয়ে দেন। আইনমন্ত্রী বলেন, ওই নারীর দোয়া ও সন্তুষ্টি তার কাছে কোটি টাকার পারিশ্রমিকের চেয়েও মূল্যবান ছিল। এ ধরনের মানবিকতাই একজন আইনজীবীর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পেশাগত জীবনে ভালো-মন্দ ও নানা ধরনের প্রলোভনের মুখোমুখি হতে হবে। তবে তাদের সত্য ও সঠিক পথ বেছে নিতে হবে। সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারলে একজন আইনজীবী সফল হতে পারবেন।
শিক্ষার্থীদের আইন সংস্কারে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রচলিত কোনো আইনে অসংগতি বা পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে মনে হলে তারা সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব ও খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পারেন। সরকার সেসব প্রস্তাব বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে।
তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের চিন্তা ও ভাবনাকে ধারণ করে দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করতে হবে। তিনি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং এ কাজে তরুণ প্রজন্মের সহযোগিতা কামনা করেন।



























