রোববার ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৩৫, ৯ আগস্ট ২০২৬

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন
ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি থেকে রাতের আঁধারে বিশেষ মেশিনের মাধ্যমে বালু তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। এ জন্য সৈকতের কাছাকাছি একটি ভবন থেকে পাইপলাইন বসানো হয়েছিল।

শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে (৮ আগস্ট) বিষয়টি জানতে পেরে সেখানে অভিযান চালায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার একটি দল। তবে অভিযান শুরুর আগেই সেখান থেকে সরে যায় বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। কলাতলী এলাকার সৈকতের দক্ষিণাংশে ভাঙ্গার মোড়সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জিও ব্যাগ, বালু উত্তোলনের মেশিন, বড় আকৃতির পাইপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আলামত পাওয়া যায়। পরে এসব জব্দ করে প্রশাসন।

পর্যটন শাখার ম্যাজিস্ট্রেট (সহকারী কমিশনার) মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, স্থানীয় কয়েকজন যুবকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের সহায়তায় অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। সৈকতের বালিয়াড়ির কাছাকাছি একটি ভবন থেকে পানির পাইপলাইন বসিয়ে বালু সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল বলে প্রাথমিকভাবে তাঁরা দেখতে পেয়েছেন। ওই ভবনে বিপুল পরিমাণ জিও ব্যাগও পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে তিনজন বিচকর্মীকে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। পাওয়া আলামত জব্দ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবনটিতে এনজিওর সেবা কেন্দ্র প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যে ভবন ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (আইডিএফ) পরিচালিত ‘ব্লু ইকোনমি সেবা ও পরামর্শ কেন্দ্র’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে ওই কেন্দ্রের সঙ্গে বালু উত্তোলনের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কক্সবাজার সদর উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক আরিয়ান ফারাবী বলেন, রাতে সৈকতে হাঁটার সময় তিনি ড্রেজারজাতীয় একটি মেশিন দিয়ে সৈকত থেকে বালু উত্তোলন করতে দেখেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে বিষয়টি পর্যটন ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান।

আরিয়ান ফারাবী বলেন, খবর পেয়ে পর্যটন ম্যাজিস্ট্রেট, থানা-পুলিশ ও সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে ততক্ষণে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সেখান থেকে পালিয়ে যান। তার অভিযোগ, কোনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এই চক্র সমুদ্র থেকে বালু তুলছিল কি না, তা খুঁজে বের করা দরকার। তিনি বলেন, সমুদ্র ও সৈকত রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। ‘সৈকত কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়’ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করিম উল্লাহ কলিম বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি দেশের প্রাকৃতিক ও পর্যটন সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ।

তিনি বলেন, উন্নয়নের নামে কিংবা কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে এই সম্পদ ধ্বংস করার সুযোগ নেই। সৈকত থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

করিম উল্লাহ কলিম বলেন, ‘এখনই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। সৈকত ও বালিয়াড়ি রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা দরকার। প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে।’

পরিবেশকর্মী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, এটি উপকূলীয় পরিবেশেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু সরিয়ে নেওয়া হলে সৈকতের স্বাভাবিক গঠন ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে ভবিষ্যতে সৈকতের ক্ষয় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তাদের মতে, কক্সবাজারের সৈকত দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। এখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হবে, অন্যদিকে পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, নিয়মিত নজরদারি ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

গত বছর সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র ভোলাগঞ্জের ‘সাদা পাথর’ এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর প্রকাশ্যে ও অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রাকৃতিক পর্যটনসম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা ও নজরদারি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

কক্সবাজারের পরিবেশকর্মী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি বড় আকার ধারণ করার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তাদের আশঙ্কা, রাতের আঁধারে নিয়মিতভাবে বালু সরিয়ে নেওয়া হলে একসময় এর ক্ষতির মাত্রা বোঝা কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের দাবি, সৈকতের বালিয়াড়ি ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে পাইপলাইন বসানো হলো এবং এর পেছনে কারও প্রভাব বা সহযোগিতা ছিল কি না, তা তদন্ত করে বের করা হোক। পাশাপাশি উদ্ধার করা মেশিন, পাইপ, জিও ব্যাগসহ অন্যান্য আলামত কীভাবে সেখানে পৌঁছাল, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

জনপ্রিয়