পোল্ট্রি উন্নয়নের খসড়া নীতিমালা নিয়ে খাত সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ
‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর চূড়ান্ত খসড়ায় মুরগির প্যারেন্ট স্টক আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ এবং বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা এই সিদ্ধান্তকে উদ্বেগজনক মনে করছেন। তাঁদের মতে, নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি শিল্প বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও ভোক্তাস্বার্থকেও প্রভাবিত করতে পারে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চলতি মাসের ১৩ তারিখে খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করা হয়। খসড়ার ৫.৮.১.২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানি করা যাবে না। কেবল একদিন বয়সী গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং বাচ্চার সংকট দেখা দিলে ক্ষেত্রবিশেষে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করা যাবে।”
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমানো নীতিমালার মূল লক্ষ্য। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাস্তবে প্যারেন্ট স্টক উৎপাদন এখনও সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে বার্ডফ্লু বা বড় ধরনের রোগ সংক্রমণ ঘটে, তবে উৎপাদন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় বাচ্চা সরবরাহ ব্যাহত হলে ব্রয়লার ও লেয়ার উত্পাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্যারেন্ট স্টক আমদানির ওপর এই বিধিনিষেধ রাখার সিদ্ধান্ত উপযুক্ত নয়। কারণ সংকটকালীন মুহূর্তে বাচ্চা বা প্যারেন্ট স্টক আমদানির জন্য দীর্ঘ ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তাই আকস্মিক সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে তা কার্যকর হবে না।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ) জানিয়েছে, নীতিমালা কার্যকর করার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। নীতিমালা প্রয়োগে সরাসরি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ডিম ও মুরগির মাংস দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিন। সরবরাহ ব্যাহত হলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি পাবে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রোটিন গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে।
পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, “নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে ত্রিমুখী সংকট তৈরি হবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন প্রান্তিক খামারি ও ভোক্তারা। এর আগে গণশুনানি ও স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়া উচিত।”
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোঃ বাহানুর রহমানও এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংকটকালীন পরিস্থিতি ও বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁদের মতে, আইন করে আমদানি নিষিদ্ধ করা সংবেদনশীল বিষয়; তাই এটি সতর্কতার সঙ্গে এবং সব অংশগ্রহণকারীর সমন্বয়ে গ্রহণ করা উচিত।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান জানিয়েছেন, নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে যাতে দেশের পোল্ট্রি খাত আরও সমৃদ্ধ হয়। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নীতিমালায় বাজার ব্যবস্থাপনা ও প্রান্তিক খামারিদের জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই, যা বাস্তবায়নে অসুবিধার সৃষ্টি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রান্তিক খামারি থেকে শুরু করে পুরো খাতের পক্ষেই সুবিধা থাকবে না, তাই বিষয়টি যুগোপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং টেকসইভাবে পুনঃমূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।



























