বুধবার ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:০৪, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ইউনূস সরকারের ১৪ মাসে ঋণ বেড়েছে ২.৬০ লাখ কোটি টাকা

ইউনূস সরকারের ১৪ মাসে ঋণ বেড়েছে ২.৬০ লাখ কোটি টাকা
ছবি: সংগৃহীত

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উন্নয়ন ব্যয় সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হলেও দেশের ঋণ বৃদ্ধির ধারা থামেনি। সরকারের ১৪ মাসে মোট ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের দেশি-বিদেশি মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়ন ব্যয় কমানো হলেও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ না হওয়া, আগের ঋণ পরিশোধের চাপ এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে সরকারকে ঋণনির্ভর থাকতে হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক এর ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়া। তার মতে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্মকর্তাদের আন্দোলনের কারণে গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। পরে বৈদেশিক ঋণ নতুন বিনিময় হারে রূপান্তরের ফলে ঋণের পরিমাণ আরও ৫৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির পূর্ণাঙ্গ তথ্য যুক্ত হলে মোট ঋণ আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যন্তরীণ উৎসের তুলনায় বৈদেশিক উৎস থেকেই বেশি ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এর ঋণের কিস্তি পেয়েছে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নিয়েছে। গত অর্থবছরে বাজেট সহায়তা ছিল ৩৪৪ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের ২০০ কোটি ডলারের তুলনায় বেশি। ফলে ১৪ মাসে বৈদেশিক ঋণ ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১০ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

গত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তুলনায় ২০১৮–১৯ অর্থবছরে এডিপি ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা প্রায় ২.৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। 

বিশ্লেষকদের মতে, আগের সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া বিল, ভর্তুকি–সংক্রান্ত দায়সহ নানা বকেয়া পরিশোধের কারণেও ঋণের চাপ বেড়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার মূলত নতুন ঋণ নিয়েছে পুরোনো ঋণ পরিশোধ এবং ঋণ পরিষেবার চাপ সামাল দিতে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ এর অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক ঋণের সুদের চাপও মোট ঋণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু বকেয়া দায় পরিশোধ করলেও নতুন সরকারের জন্য বেশ কিছু আর্থিক চাপ রেখে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভাতা এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দায়।

ঋণ-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার গঠন করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি। ফ্যামিলি কার্ড চালু করা, সরকারি চাকরিজীবদের নতুন বেতন কাঠামো বিবেচনা করাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপিকে আগামী ১০০ দিনের মধ্যেই নতুন বাজেট ঘোষণা করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী অর্থবছর কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ করতে না পারলে—নতুন সরকারের জন্য বাজেটের অংক মেলানো কঠিন হতে পারে।


জাহিদ হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, ফ্যামিলি কার্ড চালু, কৃষিঋণ মওকুফ এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের মতো প্রতিশ্রুতি পূরণে বিপুল সরকারি ব্যয় প্রয়োজন হবে। শুধু আংশিক বেতন কাঠামো বাস্তবায়নেই অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে। রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে নতুন সরকারকেও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বিএনপি আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবায়নে ঋণ-নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নতুন সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ হবে নিতে হবে। দেশের জিডিপি বৃদ্ধির যে হিস্যা ট্যাক্স হিসেবে সরকারের পাওয়ার কথা, তা আদায়ে মনোযোগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনেক প্রকল্প বাতিল করেছে, অনেক প্রকল্প হাফ ডান (অর্ধ-সম্পন্ন) অবস্থায় ফেলে রেখে অর্থায়ন স্থগিত রেখেছে। যেসব প্রকল্পে ইতোমধ্যে অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন করলে দেশের মানুষ প্রকৃতঅর্থে সুফল পাবে, সেগুলো নতুন সরকারকে বাস্তবায়ন করতে হবে। "কিন্তু, এজন্য বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে তা সম্ভব না হলে – তাদেরকেও ঋণনির্ভর হতে হবে।"

মাহবুব আহমেদ আরও বলেন, ''সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো দেওয়া, কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়াসহ বিএনপি যেসব অঙ্গীকার করেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন হবে। কিন্তু আমাদের ঋণ যে পর্যায়ে চলে গেছে, তাতে আতঙ্কিত না হলেও আশঙ্কা প্রকাশ করার যথেষ্ঠ কারণ আছে।"

সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, "নতুন সরকারকে ঋণ পরিশোধসূচি বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কারণ, প্রতিবছরই দেখা যায়, বিদেশি ঋণ পরিশোধের জন্য ইআরডি যে প্রাক্কলন করে, তার চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, "নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে শুরুতেই সংশোধিত বাজেট পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রক্ষেপণগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। একইসঙ্গে তাদের নির্বাচনী ইশতিহার পূরণে নতুন বাজেট প্রণয়নে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। তা না হলে প্রথম বাজেট দেখেই মানুষের মধ্যে হতাশা চলে আসবে।"

আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া যেসব ঋণ পুনঃদরকষাকষির সুযোগ আছে, সেগুলো নিয়ে পুনরায় আলোচনা করার পরামর্শ দেন তিনি।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া 'ঋণের বোঝা' নিয়ে নতুন সরকারকে কাজ শুরুর করতে হবে এবং বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে দেখতে হবে কোন কোন মেগা প্রকল্পে অপচয় হচ্ছে।

"এসব প্রকল্পের মধ্যে যেগুলো বাংলাদেশের স্বার্থে কাজে দেবে, সেগুলো আমরা রাখব," বলেন তিনি। 

সূত্র: টিবিএস