কিংবদন্তি অভিনেতা ব্রুস লিয়াং সিউ-লাং আর নেই
যিনি পর্দায় ছিলেন অপ্রতিরোধ্য, যাঁর চোখের দৃষ্টি আর ঘুষির শক্তিতে কেঁপে উঠত পুরো দৃশ্য—সেই মানুষটিই শেষ বিদায়ে চাইলেন নিঃশব্দতা। দুঃখ নয়, কান্না নয়—শুধু মনে রাখতে বললেন, তিনি নাকি খুব দূরের কোথাও একটি সিনেমার শুটিংয়ে গেছেন। সেই মানুষটি আর কেউ নন, হংকং মার্শাল আর্ট সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা ব্রুস লিয়াং সিউ-লাং।
গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, চীনের শেনঝেনে ৭৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বরেণ্য শিল্পী। তবে তার মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয় চার দিন পর, ১৮ জানুয়ারি। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে হংকং চলচ্চিত্রজগতের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো বলে মনে করছেন অসংখ্য ভক্ত ও চলচ্চিত্রবোদ্ধারা।
বিশ্বজুড়ে স্টিফেন চৌ পরিচালিত কালজয়ী সিনেমা ‘কুং ফু হাস্টল’-এ ভয়ংকর অথচ স্মরণীয় চরিত্র ‘বিস্ট’ হিসেবে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন ব্রুস লিয়াং। তবে তার অভিনয়জীবন কেবল একটি চরিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন হংকং সিনেমার ঐতিহাসিক ‘ফোর ড্রাগনস’-এর একজন—যে প্রজন্মে জ্যাকি চ্যান ও ব্রুস লির মতো কিংবদন্তিরাও ছিলেন সমসাময়িক তারকা।
মৃত্যুর আগে নিজের অফিসিয়াল ডৌইন অ্যাকাউন্টে ভক্তদের উদ্দেশে রেখে যান এক হৃদয়স্পর্শী শেষ বার্তা। সেখানে তিনি সবাইকে দুঃখ না করার অনুরোধ জানিয়ে লেখেন—
“আমি খুব, খুব দূরের এক জায়গায় সিনেমার শুটিং করতে চলে গেছি। বিদায় না জানিয়েই চলে যাওয়ার জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও। মনে করো, আমি অনেক দূরে কোথাও একটি সিনেমার শুটিংয়ে আছি।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। তাই তার ঘনিষ্ঠ শিষ্য আগের মতোই নিয়মিত ভিডিও পোস্ট করে গেছেন। “আমার একটু রহস্য রাখতে ভালো লাগে। আমার হয়ে ভালোভাবে বেঁচে থেকো। ভালোবাসা সবসময়ই আছে। মনে রেখো, আমি তোমাদের সবাইকে ভালোবাসি।”
১৯৭০-এর দশকে অভিনয়জীবন শুরু করেন ব্রুস লিয়াং। পর্দায় তার বাস্তবধর্মী, শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রিত মার্শাল আর্ট স্টাইল খুব দ্রুতই দর্শকের দৃষ্টি কাড়ে। টেলিভিশন সিরিজ ‘দ্য লিজেন্ডারি ফক’ এবং ‘ফিস্ট অব ফিউরি’-তে দেশপ্রেমিক চরিত্র চেন ঝেনের ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমে এশিয়াজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। তার অভিনয়ে ফুটে উঠত প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদা ও নিখাদ দেশপ্রেম।
আশির দশকে দীর্ঘ বিরতিতে গেলেও, ২০০৪ সালে স্টিফেন চৌ পরিচালিত ‘কুং ফু হাস্টল’-এ দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে তিনি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। ‘বিস্ট’ চরিত্রে তার সংযত অথচ বিস্ফোরক উপস্থিতি প্রমাণ করে, বয়স কখনোই শিল্পীর শক্তিকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না।
তার প্রয়াণে শোক প্রকাশ করে স্টিফেন চৌ ইনস্টাগ্রামে লেখেন, “চিরদিন স্মরণে থাকবেন মিস্টার লিয়াং সিউ-লাং।” অন্যদিকে জ্যাকি চ্যানও আবেগঘন বার্তায় স্মরণ করেন তাকে, তুলে ধরেন তার বহুমাত্রিক মার্শাল আর্ট দক্ষতা ও হংকং সিনেমায় অনন্য অবদানের কথা।
ব্রুস লিয়াং সিউ-লাংয়ের বিদায় কেবল একজন অভিনেতার জীবনাবসান নয়; এটি মার্শাল আর্টভিত্তিক চলচ্চিত্রের এক গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি। পর্দায় তার শক্তিশালী উপস্থিতি, অনন্য লড়াইয়ের ভঙ্গি ও শিল্পে আজীবন অবদান নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। কিংবদন্তি এই শিল্পী চলে গেলেও, তার সৃষ্টি করা চরিত্র, স্মরণীয় অভিনয় এবং দর্শকদের প্রতি রেখে যাওয়া ভালোবাসা অমর হয়ে থাকবে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এবং অগণিত ভক্তের হৃদয়ে।



























