মমতার সায়নী বিরোধী শিবিরে!
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। দলটির অন্যতম পরিচিত মুখ এবং যাদবপুরের সাংসদ সায়নী ঘোষ বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন বলে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে। একসময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে সোচ্চার ও বিশ্বস্ত সমর্থকদের একজন হিসেবে পরিচিত এই নেত্রীর অবস্থান পরিবর্তনকে রাজনৈতিক মহলে বড় ধরনের তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির মাত্র এক মাসের মধ্যেই সংসদে পৃথক গোষ্ঠী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া ২০ জন সাংসদের দলে এখন সায়নী ঘোষও যুক্ত হয়েছেন।
লোকসভার সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে বিদ্রোহী শিবিরের ওই ২০ জন সাংসদ সোমবার লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)-কে সমর্থনের প্রস্তাব দেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিভাজন কার্যত প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সায়নী ঘোষ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিতেও স্বাক্ষর করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তিনি বর্তমানে কলকাতায় নেই; বরং দিল্লিতে অবস্থান করছেন, যেখানে বিদ্রোহী সাংসদদের একটি বড় অংশ অবস্থান করছেন।
এদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আরেক সাংসদ মালা রায়ও দিল্লিতে গিয়ে বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
সায়নী ঘোষের এই অবস্থান পরিবর্তন রাজনৈতিক মহলে বিশেষ বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে তিনি শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত মুখ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না, বরং সম্প্রতি তাকে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভানেত্রীর দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তার বক্তব্য ছিল, “দিদি জিতলে বাংলা জিতবে।”
শুধু তাই নয়, অতীতে একাধিকবার তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি কখনোই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ ছাড়বেন না। সেই প্রেক্ষাপটে তার বর্তমান অবস্থানকে রাজনৈতিক অঙ্গনে নাটকীয় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে সায়নী ঘোষের দীর্ঘদিনের বিজেপি ও এনডিএ-বিরোধী অবস্থান। নারী সংরক্ষণ বিলসহ বিজেপির বিভিন্ন নীতির কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন একাধিকবার এবং বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগও এনেছিলেন প্রকাশ্যে।
বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পরও তিনি দলের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। সে সময় তার বক্তব্য ছিল, “আমরা হারিনি। ভোট চুরি ও লুটপাটের মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করা হয়েছে। ২০২৯ সালে বাংলার মানুষ এবং দেশের মানুষ, আর ২০৩১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মা-মাটি-মানুষ এর জবাব দেবে।”
নির্বাচনি প্রচারণার সময় আগুনঝরা বক্তৃতা ও আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন সায়নী ঘোষ। তবে তাকে ঘিরে নানা বিতর্কও কম ছিল না।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক বিদ্রোহ, একাধিক সাংসদের পদত্যাগ এবং দলীয় বিভক্তির জেরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট শুধু তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নয়, রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভারসাম্যকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।



























