কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ২৭
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে স্থানীয় সময় বুধবার দিবাগত রাতে রাশিয়া ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় অন্তত ২৭ জন নিহত এবং ৯১ জন আহত হয়েছেন। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো এটিকে রাজধানীর ওপর চালানো সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেনকো জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হওয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭ জনে পৌঁছেছে। আহতদের মধ্যে অনেক শিশুও রয়েছে।
হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে একটি অ্যাম্বুলেন্স স্টেশনও ছিল বলে জানিয়েছেন মেয়র ক্লিচকো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতের কিছু হামলায় প্রাণহানি বেশি হলেও এবারের অভিযানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে রুশ বাহিনী। রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় একযোগে এই হামলা চালানো হয়।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্ভাব্য বড় হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। পরে হামলা শুরু হলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের হামলার জবাবে কিয়েভের সামরিক শিল্প স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে কিয়েভ সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে রাশিয়া।
তবে ইউক্রেন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে অভিযোগ করেছে, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তকাচেনকো বলেন, হতাহতদের একটি বড় অংশই শিশু এবং রুশ বাহিনী সচেতনভাবেই সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে।
কিয়েভ মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাতভর হামলার সময় প্রায় ৫২ হাজার ৫০০ মানুষ, যার মধ্যে সাড়ে চার হাজার শিশু ছিল, ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ আশ্রয় গ্রহণের ঘটনা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিয়েভের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দারনিৎস্কি এলাকার একটি বহুতল আবাসিক ভবন। দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভবনটির বড় অংশ ধসে পড়ে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র পাশের একটি কিন্ডারগার্টেনের কাছে বিশাল গর্ত সৃষ্টি করে এবং আশপাশের ভবনগুলোতে আগুন ধরে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকারীরা অবিরাম তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙাচোরা গাড়ি, কাচের টুকরো এবং ধ্বংসস্তূপ।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দা স্ভিতলানা জানান, বিমান হামলার সময় তিনি ঘরের করিডোরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনলেও তিনি ভয় পাননি। এর আগে রুশ হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন, সেই হামলায় তার মা নিহত হন এবং পরে যুদ্ধে তার ছেলেও প্রাণ হারান।
আরেক বাসিন্দা ওলেকসি বলেন, প্রথম বিস্ফোরণের পর বাইরে বের হলে দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে উড়ে আসা কাচে তার মুখ গুরুতর জখম হয়। তিনি রাশিয়ার পাল্টা হামলার দাবি নাকচ করে বলেন, এটি ছিল একটি আবাসিক এলাকায় পরিকল্পিত হামলা।
ইউক্রেনীয় রেড ক্রস জানিয়েছে, হামলায় তাদের একটি প্রধান গুদাম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। এতে প্রায় ১৩ লাখ পাউন্ড মূল্যের ত্রাণসামগ্রী নষ্ট হয়েছে, যা দেশজুড়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
১১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কয়েক দফায় চালানো এই হামলায় প্রথমে ড্রোন, পরে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। ভোর পর্যন্ত ড্রোনের একের পর এক আক্রমণে রাজধানী কিয়েভ কেঁপে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গত দুই মাসে রাশিয়ার হামলার কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। হামলার সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও প্রতিটি হামলা এখন আগের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, অধিক শক্তিশালী এবং অনেক বড় এলাকা জুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।



























