মঙ্গলবার ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ৩০ পৌষ ১৪৩২

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৫৩, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

ফের পিঁয়াজে অস্থিরতা

ফের পিঁয়াজে অস্থিরতা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতি শীত মৌসুমে দেশে পিঁয়াজের উদ্বৃত্ত উৎপাদন হয়। এ সময় বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম হঠাৎ করে প্রতি কেজি ৬০ টাকার নিচে নেমে যায়। উৎপাদন খরচ একই থাকলেও কৃষকরা বাধ্য হয়ে লোকসানে পণ্য বিক্রি করেন। সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় বিপুল পরিমাণ পিঁয়াজ নষ্ট হয়। কয়েক মাস পর পরিস্থিতি উল্টো হয়ে ঘাটতি দেখা দেয়, তখন মধ্যস্বত্বভোগীরা সক্রিয় হয়, সরকার আমদানির অনুমতি দেয়, আর দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। এ দামের চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন নিম্ন আয়ের ভোক্তারা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বারবারের সংকটের মূল কারণ হলো খাদ্য বিকিরণ বা সংরক্ষণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা থাকলেও দেশে এখনও পিঁয়াজ, মসলাজাতীয় পণ্য বা দ্রুত নষ্ট হওয়া ফসল সংরক্ষণের জন্য পূর্ণাঙ্গ বিকিরণ কেন্দ্র চালু হয়নি। এর ফলে কৃষক, প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও রপ্তানিকারকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং দেশ হারাচ্ছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “ফসল কাটার পরবর্তী ক্ষতি ও খাদ্য নিরাপত্তার দুর্বলতাকে এটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। একটি বিকিরণ কেন্দ্র সব সমস্যার সমাধান নাও করতে পারে, কিন্তু এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর অভাব।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় প্রতি বছর উৎপাদিত পিঁয়াজের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ নষ্ট হয়। বিকিরণ সুবিধা না থাকায় কৃষকরা পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হন, ফলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ সৃষ্টি হয় এবং দাম হ্রাস পায়। খাদ্য বিকিরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত গামা রশ্মি দ্বারা পিঁয়াজের অঙ্কুরোদগম রোধ করা যায় ও জীবাণুর মাত্রা কমানো সম্ভব। এতে সংরক্ষণকাল কয়েক মাস পর্যন্ত বাড়ানো যায়। উন্নত দেশগুলোতে এবং প্রতিবেশী ভারতেও এই প্রযুক্তি নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. সারিফুল হক ভূঁইয়া জানান, “খাদ্য বিকিরণের মাধ্যমে সংরক্ষণকাল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি পরিকল্পিত বিকিরণ কেন্দ্র বাস্তবায়ন করছে, যা কৃষি খাত ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহার হবে।”

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটি পিঁয়াজ উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল ফরিদপুরে স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা গাজীপুরে স্থানান্তর করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অংশীদার, বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ) সহায়তা দিচ্ছে। প্রকল্পটি বিলম্বিত হওয়ার কারণ হিসেবে কঠোর নিরাপত্তা মান, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও মানসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণকে বলা হচ্ছে। খাদ্য বিকিরণ সংক্রান্ত অবকাঠামো প্রচলিত কৃষি প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং পরমাণু সম্পর্কিত।

বর্তমানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আওতায় খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে সীমিত বিকিরণ সুবিধা রয়েছে, যা মূলত ওষুধ শিল্পের জন্য ব্যবহৃত হয়। পিঁয়াজ বা মসলাজাতীয় পণ্য প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা নেই। এর ফলে দেশীয় বাজার ও রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। হলুদ, পিঁয়াজ ও মরিচসহ মসলার রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য মান পূরণে ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষার নমুনা পাঠাতে হচ্ছে সিঙ্গাপুর বা ভারতে, যা সময় ও খরচ উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।

১৯৯৭ সাল থেকে বাধ্যতামূলক বিকিরণ পরীক্ষার বিধান থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। যদিও বিদ্যমান পরীক্ষাগারগুলো কম খরচে ছাড়পত্র দিতে সক্ষম, শিল্প ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। সংরক্ষণ ও সংরক্ষণকাল বাড়ানোই মূল চাবিকাঠি, বিশেষ করে পিঁয়াজের মতো সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বিকিরণ অবকাঠামোর অভাব সরাসরি কৃষকদের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পিঁয়াজ, আলু ও বাঁধাকপি চাষিরা ভালো ফলন পেলেও সংরক্ষণের অভাবে লোকসানের চক্রে আটকে পড়ছেন। উদ্বৃত্ত উৎপাদন সংরক্ষণ না থাকলে আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপে পরিণত হয়। কৃষকরা সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি করতে বাধ্য হন, আর কয়েক মাস পর ঘাটতির সময় ভোক্তাদের বেশি মূল্য দিতে হয়।”

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন