শনিবার ২৭ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৫৩, ২৬ জুন ২০২৬

মাদকের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মাদকের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।

শুক্র ঢাকায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত আলোচনাসভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ’র সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথিা বক্তৃতা করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাদক নিরাময় ও গবেষণার সঙ্গে জড়িত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের সম্ভাবনাময় ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ বিনির্মাণে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে তরুণ সমাজকে অবশ্যই মাদকমুক্ত রাখতে হবে। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্যতম অঙ্গীকার ছিলো দেশের যুব সমাজকে মাদক ও জুয়ার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি। 

মন্ত্রী বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সশস্ত্র মাদক কারবারিদের সাথে ফাইট করছেন, কিন্তু তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই। এই আইনগত শূন্যতা ও আধুনিক চ্যালেঞ্জ দূর করতে আগামী ২-১ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী বিল’ উত্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে এই বাহিনীকে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অর্গান হিসেবে শক্তিশালী করা হবে। 

তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সশস্ত্র মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিদের শক্ত হাতে দমনে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণসহ আধুনিক অস্ত্র দেওয়া হবে।

মন্ত্রী জানান, শুধুমাত্র ঢাকাতেই প্রায় ৮০ হাজার মাদকের মামলা পেন্ডিং রয়েছে। বিচারক স্বল্পতার কারণে এই বিপুল সংখ্যক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি উত্তরণে সংশোধিত আইনে মামলার সংখ্যা বিবেচনায় যেখানে প্রয়োজন, সেখানে মাদকের দ্রুত বিচার নিশ্চিতে ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ স্থাপনের কঠোর বিধান রাখা হচ্ছে। 

তিনি বলেন, এ ছাড়া মাদক নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে আধুনিক ‘ডগ স্কোয়াড’ সংযোজন এবং আসামি গ্রেফতারের পর আইনি প্রক্রিয়ার অন্তর্বর্তী সময়ে রাখার জন্য ‘হাজতখানা’ স্থাপনের আইনি প্রস্তাব করা হয়েছে। মাদকের রাসায়নিক পরীক্ষার জালিয়াতি রুখতে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে উন্নত কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি ।

ডিজিটাল অপরাধের চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মাদক ও জুয়ার অপরাধ সাইবার স্পেস এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হয়েছে। মাদক পাচারকারী চক্র বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থার আড়ালে তরুণ সমাজকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৮৬৭ সালের প্রাচীন জুয়া প্রতিরোধ আইন দিয়ে বর্তমান যুগের আধুনিক অনলাইন বেটিং ও ক্রিপ্টো-অপরাধ দমন সম্ভব নয়। মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে বেনামী সিমের মাধ্যমে ওটিপি ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে যে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং হচ্ছে, তা কঠোরভাবে ট্র্যাকিংয়ের জন্য এনটিএমসি’র পরামর্শে আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার শুধু খুচরা বিক্রেতা বা বহনকারীদের ধরপাকড়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মাদক ব্যবসার মূল হোতা, অর্থ জোগানদাতা বা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। 

তিনি বলেন, মাদকের কালো টাকা দিয়ে অর্জিত সমস্ত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য নতুন সংশোধনীতে কঠোর ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮’ এবং ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’ এর আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
 
মন্ত্রী জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে এ ধরনের ৯টি মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের করেছে এবং আরও ২৩টি গুরুতর অনুসন্ধান বর্তমানে চলমান রয়েছে।

বিজিবি, কোস্টগার্ড, র‌্যাব ও পুলিশের সমন্বিত ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ঢাকার উত্তরার মতো জায়গায় জঘন্যতম সিনথেটিক ড্রাগ ‘কিটামিন’র ল্যাবরেটরি আবিষ্কার হওয়া প্রমাণ করে অপরাধীরা কতখানি আধুনিক। প্রথাগত মাদকের পাশাপাশি নতুন সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদক বা ‘নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্সেস’র প্রাদুর্ভাব মাদকাসক্তির ঝুঁকিকে আরও ঘনীভূত করেছে। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি। যারা এর ফাঁদে পড়েছেন, তারা সমাজ বা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী নন, বরং তারা রোগী। তাই তাদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে বিভাগীয় পর্যায়ে ২০০ শয্যার সরকারি নিরাময় কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। 

মন্ত্রী আরো বলেন, মাদক কোনো একক দেশের বা একক সংস্থার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। 

তিনি দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং সকল স্বেচ্ছাসেবী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

মন্ত্রী এর আগে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন প্রাঙ্গণে স্থাপিত মাদকবিরোধী বিশেষ স্টল পরিদর্শন করেন।

অনুষ্ঠানে মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের থিম সং প্রদর্শন করা হয়। মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত একজন ব্যক্তি অনুষ্ঠানে তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন। 

এছাড়া মন্ত্রী বার্ষিক মাদক প্রতিবেদন ও বিশেষ স্যুভেনিরের মোড়ক উন্মোচন করেন এবং মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার ও সনদপত্র তুলে দেন।

উল্লেখ্য, ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ উপলক্ষ্যে রাজধানীর রমনা ও সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে মাদক বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত একটি র‌্যালি বের করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য হলো- ‘বিশ্ব মাদক সমস্যা: বিদ্যমান ইস্যু, নতুন চ্যালেঞ্জ, উদ্ভাবনী প্রতিক্রিয়া’।

সূত্র: বাসস

জনপ্রিয়