শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৩৩, ১০ জুলাই ২০২৬

ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা শেখ হাসিনার

ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা শেখ হাসিনার
ছবি: সংগৃহীত

মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েই ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে টেলিফোনে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, দুই বছর আগে তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা দেশ ছেড়েছিলেন, এখন স্বেচ্ছায় ফিরে তারা আদালতে হাজির হতে চান।

বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চলা ঘণ্টাব্যাপী টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, ‘ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তবু আমাকে যেতে হবে।’সাক্ষাৎকারে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘আমার দলের নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। মৃত্যু যদি আসে, আমি চাই তা আসুক আমার নিজের মাটিতে—যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত, যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।’

নির্বাসনকালে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও টেলিফোনে এটিই শেখ হাসিনার প্রথম সাক্ষাৎকার। এই প্রথম তিনি দেশে ফেরার কোনো সময়সীমার কথা বললেন, আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা জানালেন এবং রয়টার্সকে তিনি জানান, ‘নির্বাসিত অন্য আওয়ামী লীগ নেতারাও একই পথ অনুসরণ করবেন।’ তাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত। রয়টার্স অবশ্য দলটির অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি এবং তারা কোথায় আছেন, তা-ও নিশ্চিত হতে পারেনি।

দিল্লিতে নির্বাসিত আবাস থেকে রয়টার্সকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি, আর একদিন তোমরা (নেতা-কর্মীরা) সবাই এসো। সবাই মিলে আমরা আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’

তবে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, ঠিক কখন বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন—তা তিনি জানাননি। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি এবং আমার মনে হয়, বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে আদালত কতটা প্রহসনমূলক—আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।’

ঢাকার কর্তৃপক্ষ প্রসঙ্গে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, আমাকে ফেরত পাঠাতে ভারতের কাছে বারবার চিঠি পাঠাচ্ছে। আমি নিজেই যাব।’ দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি জানিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎকারে রয়টার্সকে বলেন, ‘গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার—এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়।’ কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গেও ফেরার বিষয়ে পরামর্শ করেননি বলে জানান তিনি।

শেখ হাসিনার এসব মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্ররা রয়টার্সের অনুরোধে কোনো সাড়া দেননি। সাড়া দেয়নি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। গত এপ্রিলে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছিল, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পরীক্ষা করে দেখছে এবং তারা নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে চায়।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করে তুলতে পারে। একমুহূর্তে সরকার দুই বছরের অস্থিরতার পর স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে এতে ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েনে থাকা সম্পর্কের উন্নতিও ঘটতে পারে; নয়াদিল্লি তাকে আশ্রয় দেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের তীব্র অবনতি হয় এবং বাংলাদেশ বারবার ভারতের কাছে তাকে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানিয়ে আসছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। ওই আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার পতনের আগে ওই দমন অভিযানে ১ হাজার ৪০০ জন পর্যন্ত মানুষ নিহত হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, সরকার পতনের পর থেকে বহু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার, মামলা ও শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন।

কারাবাস নিয়ে চিন্তিত নন জানিয়ে রয়টার্সকে শেখ হাসিনা বলেন, এর আগেও তাকে কয়েকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বাবার হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বারবার আটক হন। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির অভিযোগে তাকে কারাগারে পাঠায়; পরে মুক্তি পেয়ে তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন।

এবার দেশ ছাড়ার কারণ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, ‘বিক্ষুব্ধ জনতা তার বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসায় তার জীবনের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘কোনো সরকার দীর্ঘদিন কাজ করলে ভুল হতে পারে—কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক বিচারের অধিকার জনগণের। সেই বিচারের ভার আমি জনগণের হাতেই ছেড়ে দিলাম।’

আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসন নিয়ে অনলাইন বৈঠক করেছেন বলেও সাক্ষাৎকারে জানান শেখ হাসিনা। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘তারা হয়তো আমাকে দণ্ড দিয়েছে, আমি হয়তো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম কেন স্থগিত করা হবে? আমরা যদি খারাপ করে থাকি, সেই বিচার জনগণই করুক।’
সূত্র: রয়টার্স

জনপ্রিয়