আড়াই বছরে ১০৮৩০ ধর্ষণ!
প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একেকটি পরিবার। কোনো সংখ্যার আড়ালে একটি স্তব্ধ শৈশব। কোনো মায়ের বুক খালি। কোথাওবা আবার স্বামী-সন্তানের সান্ত্বনাহীন শোক। নারী ও শিশু নির্যাতনের এই ক্ষত শুধু কাগজের হিসাব নয়। এটি একেকটি ভেঙে পড়া জীবনের গল্প। যে ক্ষত বাড়ছে আমাদেরই চেনা সমাজে। পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক এক নথিতে উঠে এসেছে এমনই এক ভয়াবহ চিত্র।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস। এ আড়াই বছরে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে ১০ হাজার ৮৩০টি। একই সময়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে ২৮৮ নারীকে। ধর্ষণের পর প্রাণ গেছে ৪২ নারী-শিশুর। পাঁচ বছরে দুই দফা আইন সংশোধনের পরও সুরক্ষা মিলছে না নারী এবং শিশুদের। উল্টো ঘটেছে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে বিচ্ছিন্নের মতো দেশ জুড়ে আলোড়ন তোলা ঘটনা। এমনকি গত সোমবার রাজধানীর দক্ষিণখানে ধর্ষণের শিকার হয়েছে দুই বছরের শিশু।
এই আড়াই বছরে ২৮ হাজার ৬৩৩ নারী ও শিশুর ৯ ধরনের অপরাধের শিকার হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে পুলিশের খাতায়। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৪৬টি। মামলাগুলোয় এজাহারভুক্ত আসামি ৯৭ হাজার ৭৫০ জন।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আসল চিত্র আরও ভয়ানক। ভুক্তভোগীদের অনেকেই যান না থানায়, ফলে প্রকৃত সংখ্যাটি আড়ালেই থেকে যায়।
যদিও গত পাঁচ বছরে দুই দফা সংশোধন হয়েছে এসংক্রান্ত আইন। ২০২০ সালে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি করা হয় মৃত্যুদণ্ড। এরপর গত বছরের ২৫ মার্চ আবার অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। ধর্ষণের মামলার তদন্তের সময় ৩০ দিন থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ১৫ দিন। পাশাপাশি বিচার শেষ করার সময় ১৮০ দিন থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে ৯০ দিনে।
নতুন আইনে বিয়ের ‘প্রলোভনে’ যৌন সম্পর্ককে আলাদা করা হয়েছে। এর সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরের কারাদণ্ড। এখন ডিএনএ পরীক্ষা আর বাধ্যতামূলক নয়। শুধু মেডিকেল সনদের ভিত্তিতেও চলতে পারে বিচার। তবে কঠোর আইনের পরও কমেনি অপরাধ।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধসংক্রান্ত মাসিক ও সমন্বিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেল, ধর্ষণের মতো অপরাধই একমাত্র উদ্বেগ নয়। একই সময়ে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হন ৯ হাজার ৬৯৭ জন নারী।
অন্যান্য ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরও ৭ হাজার ৪৩৭ জন। নির্যাতনের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১২১ জন নারী ও শিশু।
অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, নথিভুক্ত এসব তথ্যই যদি এত উদ্বেগজনক হয়, তাহলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ সামাজিক সংকোচ, পারিবারিক চাপ, লোকলজ্জার ভয় এবং বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ঘটনাই থানায় পৌঁছায় না। ফলে সরকারি হিসাব শুধু দৃশ্যমান অংশটুকুই তুলে ধরে। দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধ দমনে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
যদিও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের ভাষ্য, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন তার বাহিনীর সদস্যরা। এসব অপরাধ দমনে নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে বিশেষ অভিযান। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা। পুলিশপ্রধানের দাবি, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেল, গত আড়াই বছরে ৯ ধরনের অপরাধে ভুক্তভোগী হয়েছেন ২৮ হাজার ৬৩৩ নারী ও শিশু। এসব ঘটনায় হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৪৬টি মামলা। যেগুলোয় আসামি করা হয়েছে ৯৭ হাজার ৭৫০ জনকে। অর্থাৎ প্রতিটি ঘটনায় রয়েছে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ। এতে বোঝা যায়, অনেক অপরাধই সংঘটিত হয়েছে সংঘবদ্ধভাবে বা একাধিক ব্যক্তির অংশগ্রহণে। সরকারি তথ্যের পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণও তুলে ধরছে একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানিয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত দেশে নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও এমন অন্যান্য ঘটনায় নিহত হয়েছে ৬০৩ শিশু। একই সময়ে ২ হাজার ৫৪৭ শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনে আহত হয়েছে। ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৪০৪ শিশু ও কিশোরী।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর সময়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রভাব নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায়ও পড়েছিল। পরে পরিস্থিতির উন্নতিতে ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং মামলার অগ্রগতি তদারকি করা হয়েছে জোরদার। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে পরিস্থিতিকে পুরোপুরি সন্তোষজনক বলার সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচিত প্রতিটি ঘটনায় চেষ্টা করা হচ্ছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের স্বল্প সময়ের মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে অপরাধের প্রকৃতি বদলে যাওয়ায় চ্যালেঞ্জও বাড়ছে।
নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, শুধু অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নিলেই হবে না। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা বাড়াতে হবে।
হঠাৎ করেই যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে মত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মুসতাসীম তানজীরের। তিনি বললেন, ‘কিছু মাদকের প্রভাবে যৌন উত্তেজনা অনেক বেড়ে যায়। সেবনকারীদের যৌন অপরাধে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করে। সরকারের উচিত কোন কোন মাদকের মধ্যে এমন উপাদান রয়েছে, তা নির্ণয় করে এর প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া। ওই গবেষণায় মনোবিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকদেরও রাখা যেতে পারে।’ একই সঙ্গে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগের কথাও বলছিলেন এই আইনজীবী।
অপরাধ গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও আইনগত চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিচারব্যবস্থা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা এবং পরিবারের সমন্বিত ভূমিকা।
পাঁচ বছরে আইনের সংশোধন দুবার: ২০২০ সালে সিলেট ও নোয়াখালীর দলবদ্ধ আলোচিত ধর্ষণের ঘটনার পর আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি করা হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। একই সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় বাধ্যতামূলক। এরপর মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশ জুড়ে জোর প্রতিবাদের পর ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। সংশোধিত আইনে ধর্ষণের মামলার তদন্তের সময় ৩০ থেকে কমিয়ে ১৫ দিন এবং বিচার শেষ করার সময় ১৮০ থেকে ৯০ দিনে নামিয়ে আনা হয়। তবে প্রয়োজন হলে আদালত সময় বাড়াতে পারবেন।
সংশোধিত আইনে বিয়ের ‘প্রলোভনে’ যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণের মূল ধারা থেকে আলাদা করে ৯(খ) ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আদালত প্রয়োজন মনে করলে শুধু মেডিকেল সনদের ভিত্তিতেই বিচার পরিচালনা করতে পারবেন। ডিএনএ পরীক্ষা আর বাধ্যতামূলক নয়। বর্তমান আইন অনুযায়ী ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।
যেভাবে কমিয়ে আনা যায় অপরাধ: নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, শুধু অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নিলে হবে না। অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকেও হতে হবে আরও দায়িত্বশীল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বললেন, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিরোধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা এবং মানসিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।’ এ সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কৌশল— এমন মত দিয়ে বলছিলেন, ‘অন্যথায় মামলার সংখ্যা বাড়লেও নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সহজে কাটবে না।’
সূত্র : আগামীর সময়



























