রোববার ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩

আশরাফুল ইসলাম, শেকৃবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৩:০১, ১৬ আগস্ট ২০২৬

অটোমেশন-সৌরশক্তিতে শেকৃবির স্মার্ট ড্রায়ার, বদলাবে কৃষি অর্থনীতি

অটোমেশন-সৌরশক্তিতে শেকৃবির স্মার্ট ড্রায়ার, বদলাবে কৃষি অর্থনীতি
ছবি: প্রতিনিধি

মৌসুমে উৎপাদন বেশি, কিন্তু সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত—বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে এই বৈপরীত্যের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষি ও মৎস্যপণ্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে মাছ, ফল ও সবজি সংরক্ষণে এখনো রোদনির্ভর প্রচলিত পদ্ধতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। এতে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার পাশাপাশি পণ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয় নানা ঝুঁকি। এই সমস্যা মোকাবিলায় অটোমেশন, IoT ও সৌরশক্তিনির্ভর একটি স্মার্ট ড্রায়ার উদ্ভাবন করেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের উদ্ভাবিত IoT-Based SAU Smart Dryer-এ মাছ, মাংস, সি-ফুড, আম, কাঁঠাল, কলা, টমেটো, মরিচ ও বিভিন্ন শাকসবজিসহ প্রায় ২৫০ ধরনের পণ্য প্রক্রিয়াজাত করার সম্ভাবনা রয়েছে। দিন-রাত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পণ্য শুকানোর পাশাপাশি কাঁচামালকে পাউডার, চা, জার্কি ও শুকনো স্লাইসসহ বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্যে রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে।

প্রযুক্তিটির গবেষণা ও উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিয়েছেন ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা। অটোমেশন ব্যবস্থায় সহযোগিতা করেছে SAU-RIC।

আবহাওয়ার বাধা ছাড়াই শুকানো

বাংলাদেশে মাছ ও শুঁটকি শুকানোর প্রচলিত পদ্ধতিতে খোলা আকাশের নিচে রোদ ও বাতাসের সাহায্যে কয়েক দিন ধরে পণ্য শুকানো হয়। বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ, অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা তাপমাত্রার ওঠানামায় এ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। পাশাপাশি ধুলাবালি, মাছি ও পোকামাকড়ের সংস্পর্শে পণ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

SAU Smart Dryer-এ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দিন-রাত শুকানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বাইরের আবহাওয়া প্রতিকূল হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। উদ্ভাবন-সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় শুকানোর সময় প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

মোবাইলেই অটোমেশন নিয়ন্ত্রণ

ড্রায়ারের ভেতরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সেন্সরের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যায়। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দূর থেকেও ড্রায়ারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত পরিবেশ বজায় রাখতে অটোমেশন ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে।

ড্রায়ারের এক্সহস্ট ফ্যান পণ্য থেকে নির্গত আর্দ্রতা বাইরে বের করে দেয়। রোটেটিং ফ্যান ভেতরের তাপ সমভাবে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। এতে বিভিন্ন র‌্যাকে থাকা পণ্যের জন্য তুলনামূলকভাবে সমান শুকানোর পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।

সৌরশক্তি ও ব্যাটারিতে হাইব্রিড ব্যবস্থা

ড্রায়ারটিতে সৌরশক্তি, ব্যাটারি ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুতের সমন্বয়ে হাইব্রিড ব্যবস্থা রয়েছে। দিনের বেলায় সৌরশক্তি ব্যবহার করা যায় এবং অতিরিক্ত শক্তি ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা সম্ভব। রাতে সেই শক্তি ব্যবহার করে ইনফ্রারেড হিটারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তাপ সরবরাহ করা যায়।

ফলে শুধু সূর্যের আলো পাওয়া গেলেই ড্রায়ার চালানো যাবে—এমন সীমাবদ্ধতা নেই। প্রতিকূল আবহাওয়াতেও উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

৭–৮ লাখ টাকায় এক টনের ড্রায়ার

বিভিন্ন সক্ষমতার ড্রায়ার তৈরির সুযোগ রয়েছে। এক টন ধারণক্ষমতার একটি ড্রায়ারের আকার প্রায় ২০ ফুট × ১২ ফুট × ৮ ফুট। ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কেজি ধারণক্ষমতার ইউনিটও স্থাপন করা সম্ভব।

উদ্ভাবক ড. মো. মাসুদ রানা জানিয়েছেন, এক টন ধারণক্ষমতার একটি ড্রায়ারের ইন্সটলেশন কস্ট প্রায় ৭–৮ লাখ টাকা। ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করা সম্ভব হলে ১–২ মাসের মধ্যেই বিনিয়োগের খরচ তুলে আনা সম্ভব বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তবে প্রকৃত ব্যয় ড্রায়ারের নকশা, উপকরণ, অটোমেশন, সৌরব্যবস্থা ও স্থাপনার ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। একইভাবে বিনিয়োগ ফেরতের সময় পণ্য, উৎপাদনক্ষমতা, কাঁচামালের দাম, বাজারদর ও পরিচালন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে।

কাঁচামাল থেকে উচ্চমূল্যের পণ্য

প্রযুক্তিটির বড় সম্ভাবনা শুধু কৃষিপণ্য সংরক্ষণে নয়, বরং কাঁচামালকে মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্যে রূপান্তরে।

ইতোমধ্যে আমের পাউডার, বিটরুট পাউডার, রোজেলা চা, লেমন চা, কাঁঠালের পাউডার, বিফ জার্কি, ফিশ জার্কি, শুকনো আনারস, কলার পাউডার, করলার পাউডার, কাঁচা মরিচ ও ধনিয়াপাতার পাউডারসহ শতাধিক পণ্য তৈরির কথা জানানো হয়েছে।

মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদিত আম, কাঁঠাল, কলা, টমেটো, মরিচ ও বিভিন্ন সবজি শুকিয়ে সংরক্ষণ করা গেলে সেগুলো সারা বছর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে মৌসুমি উদ্বৃত্ত পণ্য নষ্ট হওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে বাজারজাত করা সম্ভব হবে।

কৃষকের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা

ড. মো. মাসুদ রানা বলেন, “বাংলাদেশে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদিত কৃষি ও মৎস্যপণ্য সংগ্রহের পর কীভাবে নিরাপদে সংরক্ষণ, শুকানো ও মূল্য সংযোজন করা যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। SAU Smart Dryer সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান।”

তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি ড্রায়ার তৈরি করা নয়; বরং কৃষক ও মৎস্যজীবীদের উৎপাদিত কাঁচামালকে স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করে একটি টেকসই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা।”

কোনো এলাকার আম, কাঁঠাল, কলা, মাছ, মরিচ কিংবা শাকসবজিকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে শুকানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিং করা গেলে কৃষক কাঁচা পণ্যের তুলনায় বেশি মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের উদ্যোগ

উদ্ভাবক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (BFDC) ও মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রযুক্তিটি স্থাপন ও পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও প্রযুক্তিটি স্থাপন করে শুঁটকি উৎপাদন ও বাজারজাত করছে এবং রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তিটি মাঠপর্যায়ে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করা গেলে কৃষিপণ্যের পোস্ট-হারভেস্ট লস কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে শুকানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

তবে প্রযুক্তিটির প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ধারণে কাঁচামালের দাম, উৎপাদন ব্যয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ, শ্রম, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাজারমূল্যের বিস্তারিত তুলনামূলক হিসাব প্রয়োজন।

বদলাতে পারে কৃষি অর্থনীতির চিত্র

সৌরশক্তি, ব্যাটারি, ইনফ্রারেড হিটার, সেন্সর, অটোমেশন ও IoT প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি SAU Smart Dryer কেবল একটি শুকানোর যন্ত্র নয়; এটি কৃষি ও মৎস্যপণ্যের সংরক্ষণ, মূল্য সংযোজন ও বাজার সম্প্রসারণের একটি সম্ভাবনাময় প্ল্যাটফর্ম।

মৌসুমি উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্যকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য ও উচ্চমূল্যের প্রক্রিয়াজাত পণ্যে রূপান্তর করা গেলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নতুন শিল্প ও উদ্যোক্তা তৈরি হতে পারে। যথাযথ মাননিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় প্রযুক্তিটির বিস্তার ঘটানো গেলে পোস্ট-হারভেস্ট লস কমানোর পাশাপাশি দেশের কৃষি অর্থনীতির চিত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে।

জনপ্রিয়