‘কুড়িতে ছিলাম কুঁড়ি, ত্রিশে হয়েছি নদী, চল্লিশে বুঝেছি—আমি আসলে সমুদ্র’
বয়সের ক্যালেন্ডারে সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু একজন নারীর স্বপ্ন, রঙ কিংবা নিজেকে উদযাপনের অধিকার কি তাতে কমে যায়? সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে সেই উত্তরই যেন নিজের জীবন ও অবস্থান দিয়ে দিচ্ছেন অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্য। লাল পাড়ের শাড়ি থেকে সুইম স্যুট—যে পোশাকেই তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছেন, সেখানেই তাকে শুনতে হয়েছে কটাক্ষ, সমালোচনা আর বয়স নিয়ে বিদ্রূপ। কিন্তু থেমে থাকার মানুষ নন তিনি; বরং সেই সমালোচনার জবাব দিলেন আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদার ভাষায়।
শনিবার (২৭ জুন) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাল শাড়ি ও গাঢ় রঙের লিপস্টিকে তোলা একটি সাহসী ছবি পোস্ট করেন অপরাজিতা আঢ্য। ছবির সঙ্গে যুক্ত বার্তায় তিনি সমাজের তথাকথিত ‘বয়সের খাঁচা’ এবং নারীদের প্রতি প্রচলিত দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে সরব হন। চল্লিশ পেরোনো মাত্রই যখন অনেক নারীকে ‘বুড়ি’ তকমা দিয়ে তাদের আনন্দ, শখ কিংবা নিজেকে সাজিয়ে তোলার ইচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, তখনই প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠেন এই অভিনেত্রী।
অপরাজিতা লিখেছেন, “চল্লিশ ছুঁলেই সবাই বলে, ‘উফ! বুড়ি হয়ে গেলে!’ আমি বলি, ‘বেশ তো ভাই, বয়সটা কি ফ্রিজে রেখে দেব নাকি?’ চুলে দুটো সাদা রং, মুখে দু-চারটে ভাঁজ, তাতেই যেন সমাজের চোখে আমি পুরোনো এক সাজ!”
এরপর একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি সমাজের মানসিকতার দিকে আঙুল তোলেন। তার কথায়, “বয়স বাড়লে কি ইএমআই কমে? সংসারের চিন্তা থামে? সকালের রান্না নিজে হয়? নাকি কাপড়গুলো নিজেই কাচে? সন্তানের দায়িত্ব কমে? মায়ের চিন্তা ফুরোয়? বাড়ির হিসেব মেটে? না, কিছুই তো কমে না। শুধু বাড়ে মানুষের উপদেশ—‘এত লাল শাড়ি কেন? এত সাজো কেন? এই বয়সে নাচ? এই বয়সে প্রেমের গান?’ বয়স কি বিদ্যুতের বিল, যে নির্দিষ্ট দিনে কেটে যাবে রং?”
চল্লিশের পর নিজেকে যেন নতুন করে চিনেছেন তিনি। সেই উপলব্ধির কথা বলতে গিয়ে অপরাজিতা বলেন, “আমি তো সেই মানুষ, শুধু অভিজ্ঞতা একটু বেশি, হাসিটা একটু গভীর, কান্নাটা একটু চুপচাপ, আর নিজেকে ভালোবাসাটা আগের চেয়ে অনেক বেশি। কুড়িতে ছিলাম কুঁড়ি, ত্রিশে হয়েছি নদী, চল্লিশে এসে বুঝেছি—আমি আসলে সমুদ্র। আমার ঢেউ আছে, আমার গভীরতা আছে, আমার ঝড় আছে, আর আছে নিজের মতো বাঁচার সাহস।”
সমাজের উদ্দেশে তার বার্তা আরও স্পষ্ট ও দৃঢ়। তিনি বলেন, “বয়স বাড়া অপরাধ নয়, অপরাধ হলো একজন নারীর বয়স দেখে তার রঙিন মনটাকে অবসর দিয়ে দেওয়া। আমি বুড়ি নই, আমি পরিণত। আমি শেষ নই, আমি পূর্ণ। আর যদি লাল শাড়ি পরে, ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে, হেসে একটা ছবি তুলি—তাহলে জেনে রেখো, আমি বুড়ি হইনি, আমি জীবনটাকে উদযাপন করছি। কারণ নারী বুড়ো হয় না, নারী শুধু প্রতি বছর আরো একটু গল্প হয়ে ওঠে।”
একান্নবর্তী পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অপরাজিতা আঢ্য ব্যক্তিজীবনেও সমানভাবে আলোচিত। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি টলিউডের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার অতনু হাজরাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পরও তিনি যৌথ পরিবারের আবহেই জীবন কাটিয়েছেন।
জৈবিক সন্তানের মা না হলেও মাতৃত্বের অনুভূতি থেকে দূরে নন এই অভিনেত্রী। তার জীবনে রয়েছে গার্গি নামের এক পালিত মেয়ে, যিনি পেশায় একজন ব্যাংকার। গার্গি অপরাজিতা ও অতনুকেই নিজের মা-বাবা হিসেবে পরিচয় দেন। হাওড়ার বাসিন্দা গার্গি কৈশোরের শেষভাগে এসে তাদের পরিবারের অংশ হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তার বয়স ৩২ বছর।
অভিনয়জীবনে ১৯৯৮ সালে ‘শিমুল পারুল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে অপরাজিতার। এরপর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি উপহার দিয়েছেন একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা ও স্মরণীয় চরিত্র। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘চুপ কথা’, ‘গয়নার বাক্স’, ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’, ‘বেলা শেষে’, ‘প্রাক্তন’ ও ‘সমান্তরাল’।
পর্দার চরিত্রের মতো বাস্তব জীবনেও অপরাজিতা আঢ্য যেন এক সাহসী উচ্চারণের নাম—যিনি মনে করিয়ে দেন, বয়স কেবল সময়ের হিসাব, জীবনের নয়।



























