শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭:৫০, ১৪ আগস্ট ২০২৬

সঠিক পথে না এলে ভারতকে কড়া জবাব দেবে পাকিস্তান

সঠিক পথে না এলে ভারতকে কড়া জবাব দেবে পাকিস্তান
ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের পানির প্রতিটি ফোঁটাকে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমারেখা হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেশী ভারতকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তিনি বলেছেন, ভারত সঠিক পথে ফিরে না এলে পাকিস্তান এর সরাসরি জবাব দেবে।

বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাজধানী ইসলামাবাদে ‘ইয়াদগার-ই-ফাতাহ’ বা বিজয় স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এ হুঁশিয়ারি দেন শেহবাজ শরিফ। সাম্প্রতিক সময়ে সিন্ধু নদের পানি বণ্টন নিয়ে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার মধ্যেই তাঁর এই বক্তব্য এলো।

দেশপ্রেম ও জাতীয় উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটির উদ্বোধন করা হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির যৌথভাবে এর উদ্বোধন করেন।

অনুষ্ঠানে শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘ইয়াদগার-ই-ফাতাহ’ পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব ও সামরিক সক্ষমতার প্রতীক। ‘মারকা-ই-হক’ নামে বর্ণিত সামরিক অভিযানে সাফল্যের জন্য ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন দলকে অভিনন্দন জানান তিনি।

মাত্র আট মাসে অনন্য নকশার এই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছে বলেও জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

ভারতের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় শেহবাজ বলেন, পাকিস্তান এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়। তবে তাদের শান্তির আকাঙ্ক্ষাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। পাকিস্তানের পানির অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের পানির প্রতিটি ফোঁটাই পাকিস্তানের জন্য ‘রেড লাইন’।

সশস্ত্র বাহিনীর প্রশংসা করে শেহবাজ শরিফ বলেন, সামরিক বাহিনীর সাফল্যে পুরো জাতির মাথা উঁচু হয়েছে এবং প্রতিপক্ষকে অত্যন্ত লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। পাকিস্তানের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতে দেশটির সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে।

ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বকে নতুন সংঘাত থেকে রক্ষা করতে তাঁর দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। আগামী দিনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও জোরালো হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রসঙ্গে শেহবাজ শরিফ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর ভাষণে কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন ইস্যুও গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পাকিস্তানের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে কাশ্মীরিদের আত্মত্যাগ কোনোভাবেই বৃথা যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে যেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত না হয়, সে বিষয়েও কাবুল প্রশাসনকে সতর্ক করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন শেহবাজ। তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ জাতিকে কোনো পরাশক্তি পরাজিত করতে পারে না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে জন্য সব পক্ষকে দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানান তিনি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী, সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতিক, সিনেট চেয়ারম্যান ও জাতীয় পরিষদের স্পিকার উপস্থিত ছিলেন। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রদেশের পুলিশ, আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তানের প্রশাসনিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

পাকিস্তানের দাবি, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতের স্মৃতি ও তথাকথিত বিজয়কে স্মরণ করে ‘ইয়াদগার-ই-ফাতাহ’ নির্মাণ করা হয়েছে। দেশটির সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরে একটি হামলার পর ২০২৫ সালের ৬ ও ৭ মে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে পাকিস্তান পূর্ণ শক্তিতে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। চার দিনের ওই সংঘাত ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়।

পাকিস্তান দাবি করে, ওই সংঘাতে ফ্রান্সের তৈরি রাফালসহ ভারতের কয়েকটি যুদ্ধবিমান এবং বেশ কিছু ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছিল। তবে সংঘাতের প্রকৃতি, উভয় পক্ষের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং যুদ্ধবিমানের সংখ্যা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দাবিতে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফলে এসব দাবির অনেকটাই দুই দেশের নিজ নিজ সরকারি ভাষ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

সিন্ধু নদের পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধও দুই দেশের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে। ভারত চুক্তিটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান পানির অধিকারকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে।

এরই ধারাবাহিকতায় শেহবাজ শরিফের সর্বশেষ বক্তব্যে পানিকে সরাসরি ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করা এবং ভারতকে ‘সঠিক পথে’ ফেরার আহ্বান দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনার নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের এই টানাপোড়েনে পানি এখন শুধু সম্পদ নয়, দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

সূত্র: ডন

জনপ্রিয়