শুক্রবার ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:২৫, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

পরকীয়া-ঘুষে তোলপাড় বিমান বাংলাদেশ

পরকীয়া-ঘুষে তোলপাড় বিমান বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিয়ে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। টিকিটের দাম ও যাত্রী সেবার মান নিয়ে সারাবছরই হরেকরকম আলোচনা হয় রাষ্ট্রীয় এই বিমান সংস্থা নিয়ে। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতির কৌশলও পরিবর্তন হয়েছে বিমানপাড়ায়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের পদের ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে অতীতের মতো বর্তমানেও এসব বন্ধ করতে পদক্ষেপ নিয়েছে বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখা।

এবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যুক্ত হয়েছে নতুন বিতর্ক 'কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও পরকীয়া প্রেম'। সংস্থাটির জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার (জেজিএসও) ফিরোজ-উজ-জামানের (পি-৩৬৫০৭) সঙ্গে গ্রাউন্ড সার্ভিস এ্যাসিসটেন্ট জান্নাতুল জেনানের (জি-৫৩০০৮) অনৈতিক সম্পর্ক ও পরকীয়া প্রেমের কাহিনী আলোচনার তুঙ্গে।

এছাড়াও এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া, অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা, অফিসে ইউনিফর্ম পরিধান না করা, সহকর্মীদের উপর প্রভাব খাটানো, ডিউটি রোস্টার ও হজ পোস্টিং প্রক্রিয়াকে বাণিজ্যিক রূপ দেয়া, ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যে বেআইনি আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখা উভয়ের বিরুদ্ধেই এসব অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে। বিমানের ভাবমূর্তি, নৈতিক মান ও সেবা-নিরপেক্ষতার চেতনারও পরিপন্থী হয়েছে উল্লেখ করে গত বছরের ২ নভেম্বর ফিরোজ-উজ-জামানকে চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। 

বিমানের পরিচালক প্রশাসন ও মানবসম্পদ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কর্মকর্তা মো. নওসাদ হোসেনের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ফিরোজ-উজ-জামানের কর্মকাণ্ড শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেই বিপন্ন করেনি, তিনি বাংলাদেশ বিমান কর্পোরেশন কর্মচারী (চাকরি) প্রবিধানমালা ১৯৭৯ এর ৫৫ ধারার পরিপন্থী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায় খোরপোষ ভাতা পাবেন এবং ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে নিয়মিত হাজিরা দিতে বলা হয় তাকে।

২০২৫ সালের ৩০ মার্চ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮৪ লাখ টাকা বেআইনিভাবে আদায় করার অভিযোগও রয়েছে ফিরোজ-উজ-জামানের বিরুদ্ধে।

বিমান বাংলাদেশে জান্নাতুল জেনানের স্বামী সাহেদ মাহমুদ সজলের করা অভিযোগ তদন্তে বেড়িয়ে আসে এমন তথ্য। বিমানের এই দুই কর্মকর্তার অনৈতিক সম্পর্ক-অনিয়ম ও দাপ্তরিক কাজে অবহেলার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত রিপোর্টে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ১১ পৃষ্ঠার ওই 'গোপনীয়' তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার শুরু, ফিরোজের সঙ্গে জেনানের অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি, ঘটনা সংশ্লিষ্ট বিমান কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং অভিযোগকারী অর্থাৎ জেনানের স্বামী সজলের বক্তব্যও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

এদিকে, ফিরোজ-উজ-জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করলেও গ্রাউন্ড সার্ভিস এ্যাসিসটেন্ট জান্নাতুল জেনানকে পাঠানো হয়েছে বিমান বাংলাদেশের যশোর কার্যালয়ে। বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখার গত ৪ জানুয়ারি পৃথক অভিযোগনামায় দু'টি বিভাগীয় মামলার উল্লেখ করা হয়। ফিরোজ-উজ-জামানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নম্বর ৩৮৪৪০ এবং জান্নাতুল জেনানের বিরুদ্ধে মামলা নম্বর ৩৮৪৫। বিমান কর্মকর্তা ফিরোজের বিরুদ্ধে এছাড়াও জুনিয়র নারী কর্মীকে দাপ্তরিক পরিধির বাইরে হোয়াটসঅ্যাপে অশোভন বার্তা, কু-প্রস্তাব এবং টাকা ধার নিয়ে ফেরত না দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে একটি গণমাধ্যমের কাছে আসা এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাজধানীর উত্তরায় গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর একটি বাড়ির সামনে হাতাহাতিতে জড়ান জেনানের স্বামী সজল ও ফিরোজ। ওই বাড়িতেই জেনান ও তার মা বসবাস করতেন। জেনানের স্বামীর অভিযোগ, জেনানের সঙ্গে ওই বাড়িতে যাতায়াত করতেন ফিরোজ।

বিমানের ওই তদন্ত প্রতিবেদনে, ফিরোজের সঙ্গে সখ্যতা তৈরির কথা জেনান স্বীকার করলেও, জবানবন্দিতে ফিরোজ পুরো বিষয়টিকে অসত্য বলে আখ্যায়িত করেছেন।

অভিযুক্ত সাময়িক বরখাস্ত বিমান কর্মকর্তা ফিরোজ-উজ-জামানের সঙ্গে প্রতিবেদনটি নিয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও এড়িয়ে গেছেন তিনি।

অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানান, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান; যা সম্পন্ন হলেই সরকারি নিয়ম মেনে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে, ফিরোজ-উজ-জামানকে সাময়িক বরখাস্ত ও জান্নাতুল জেনানকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে, অর্থাৎ এক অপরাধে দুই রকমের শাস্তি দেয়া হয়েছে- এ বিষয়ে বিমানের এই মুখপাত্র বলেন, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।