বুধবার ২৪ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশিত: ০০:২৫, ২৪ জুন ২০২৬

বিটিআরসিতে ৮ জনের অবৈধ নিয়োগ

বিটিআরসিতে ৮ জনের অবৈধ নিয়োগ
ছবি: সংগৃহীত

এক যুগের বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) চাকরিতে। দীর্ঘ এই চাকরী জীবনে পেয়েছেন একাধিক কাঙ্খিত পদোন্নতি, কেউ তৃতীয়বারের মত পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। এতদিন পর প্রশ্ন উঠেছে বিটিআরসিতে যাদের চাকরিই হয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পদোন্নতি পায় কিভাবে?
 
নতুন করে বিটিআরসির ৮ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ অবৈধ পন্থায় ও বিজ্ঞপ্তির শর্ত ভেঙ্গে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছেন- সেলিনা পারভীন, মো. মাহবুবুর রহমান, মোহাম্মদ কামরুল হাসান, মুহাম্মদ জাকারিয়া ভূঁইয়া, তৌসিফ শাহরিয়ার, তানজারা বিনতে আনসার, মাসুদ কামাল ও এফএম সোয়েব শাহরিয়ারের নাম। 

জানা গেছে, নিয়োগবিজ্ঞপ্তির শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ জেলা কোটায় আবেদন করেছিল, কারও ছিল প্রয়োজনীয় সনদের অনুপস্থিতি, বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতার অমিল এমনকি যেই পদে নিয়োগের কথা উল্লেখ নেই সেই পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এই আট জনকে। এতসব অনিয়ম ও দুর্নীতি করে কিভাবে কার ক্ষমতায় ও তদবীরে এদেরকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়া হলো তার হদিস মিলেনি এক যুগেও। 

সূত্র জানায়, চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে জেলা কোটায় আবেদনের সুযোগ না থাকলেও তিন জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে বর্তমানে উপ-পরিচালক (প্রশাসন) পদে কর্মরত সেলিনা নীলফামারী জেলার কোটায় সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ), উপ-পরিচালক (লিগ্যাল এন্ড লাইসেন্সিং) মাহবুবুর বাগেরহাট জেলা কোটায় সহকারী পরিচালক (আইন) ও উপ-পরিচালক (লিগ্যাল এন্ড লাইসেন্সিং) কামরুল ঢাকা জেলার প্রার্থী হিসেবে সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে চাকরি পান।

অপরদিকে, বিএসসি সনদ না থাকায় যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়া প্রার্থীও সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে চাকরি পেয়ে এখন সিনিয়র সহকারী পরিচালক (ইএন্ডও) পদে আছেন জাকারিয়া। শিক্ষাছুটিতে বিদেশে অবস্থান করলেও সিনিয়র সহকারী পরিচালক তৌসিফের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত শর্তের মিল ছিল না। বর্তমানে কর্মরত তানজারা বিনতে আনসারের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে অনুন্য দ্বিতীয় শ্রেণির স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইউজিসি স্বীকৃত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ তার ছিল না। তবুও সে এখন বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক।

পুনর্নির্মাণ হবে ৫৯২ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যয়ের প্রস্তাব ২৭২৭ কোটি টাকা
স্টোর অফিসার মাসুদের ক্ষেত্রে যেন পুকুর জালিয়াতি করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বাণিজ্য বিভাগ থেকে স্নাতক চাওয়া হলেও বিজ্ঞানে এইচএসসি পাশের সনদ দিয়ে সহকারী স্টোর কিপারের চাকরি বাগিয়ে নেয়। 

আর সোয়েবের জন্য তদবীর এতোই শক্তিশালী ছিল যে বিজ্ঞপ্তিতে পদ নেই তবু তাকে চাকরি দিতেই হবে তাই দেওয়া হলো পদবিহীন পদে নিয়োগ। ব্যক্তিগত সহকারী পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও পদোন্নতি পেয়ে সে এখন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা।

জানতে চাইলে বিটিআরসির মিডিয়া কমিউনিকেশন এন্ড পাবলিকেশন উইংয়ের উপ-পরিচালক মো. আব্দুস শাহীদ চৌধুরী বলেন, এই বিষয়ে আমি অবগত নই। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।

বিটিআরসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রত্যেক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে সব বিষয়ের ওপর সরকারিভাবে নিরীক্ষা পরিচালিত হয় ২০২০ সালে। অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতিপ্রাপ্তদের বিষয়টি সেবারই প্রথম ধরা পড়ে। কমিশনারসহ শতাধিক জনকে নিয়োগ ও অন্তত এক ডজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয় স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও বিধি ভঙ্গ করে।

এখানে উল্লেখ্য, ২৭ জন সহকারী পরিচালক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও উপ-সহকারী পরিচালকসহ ২৯ জন ২০০৯ সালের কোনো প্রকার পরীক্ষায় ছাড়াই নিয়োগ পান। একজনও বিভাগীয় প্রার্থী না হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে দেখিয়ে অনিয়ম করে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা অতিক্রম করার পরও প্রার্থীদের বয়স প্রমার্জন করে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে। 

পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে তদন্ত কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। সে প্রতিবেদনে অনিয়মের সত্যতা খুঁজে পায়। ২০২৩ সালে আবারও মন্ত্রণালয় কর্তৃক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও সেই প্রতিবেদনে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালে গঠিত তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রতিবেদন জমা দিলেও এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিটিআরসি।

ড. ইউনূসের আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব একাধিকবার তাগাদা দিলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিটিআরসি। সেই সরকারের শেষ পর্যায়ে এসে নামমাত্র কয়েকজনকে ওএসডি করে সান্ত্বনা দেয়, পরে তাদের কয়েকজনের ওএসডি প্রত্যাহার করে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জনের বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট করে বিটিআরসির ছয়জন কর্মকর্তা। এই অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে উল্টো রিটকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় বিটিআরসি।

পরে এসব অবৈধ নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়গুলো অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্রেও উঠেও আসে। গত ৯ মার্চ উচ্চ আদালত এক রুল জারি করে জানতে যায় যে, নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনিয়ম কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।

সবশেষ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত বছরের ২৩ এপ্রিল বিটিআরসিতে অভিযান চালিয়ে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা খুঁজে পায়। এখনো দুদকে এবিষয়ে গভীর অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সূত্র: টাইমস টুডে

সর্বশেষ

জনপ্রিয়