যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বেড়েছে ১১৩ শতাংশ, পোশাক রফতানি কমেছে
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমলেও দেশটি থেকে বাংলাদেশের আমদানি দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি বেড়েছে ১১৩ শতাংশের বেশি। নতুন বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব, জ্বালানি ও কৃষিপণ্য আমদানি এবং ভবিষ্যতে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্য আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ ১৮৯ কোটি ৬২ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি-মার্চ সময়ে আমদানি হয়েছিল ৬০ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পণ্য। এপ্রিল-জুন সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৯ কোটি ৬ লাখ ডলারে। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১১৩ দশমিক ১১ শতাংশ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে এখনও নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ৫৩৯ কোটি ডলারে নেমেছে। তবে আগস্টে একক মাসের হিসাবে বাংলাদেশের পোশাক আমদানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
ফলে একদিকে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ওই দেশ থেকেই বাড়ছে জ্বালানি, তুলা, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের আমদানি। এতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তিন মাসে আমদানি দ্বিগুণের বেশি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, বিটুমিনসহ খনিজ জ্বালানি ও তেলজাত পণ্য। এ খাতে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৭৭ কোটি ৫২ লাখ ডলার। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ১৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।
এ ছাড়া এপ্রিল-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪ কোটি ২৬ লাখ ডলারের তুলা, ১০ কোটি ৪১ লাখ ডলারের লোহা ও ইস্পাত, ৪ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের খাদ্যশস্য এবং ৭ কোটি ২৯ লাখ ডলারের সয়াবিন ও পশুখাদ্য আমদানি হয়েছে। এ সময় ২ কোটি ১৯ লাখ ডলারের পরিমাপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি, ১ কোটি ৯১ লাখ ডলারের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং ১ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের প্লাস্টিক সামগ্রীও আমদানি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধির পেছনে নতুন বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি পণ্যের মান, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে।
বাণিজ্য চুক্তির পর আমদানি বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির পর দেশটি থেকে আমদানি বাড়ার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি, কৃষিপণ্য, তুলা এবং অন্যান্য পণ্য কেনার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “এটা তো হওয়ারই কথা ছিল। ফেব্রুয়ারিতে চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তির আওতায় এখন দেশটি থেকে পণ্য আমদানি হচ্ছে। চুক্তির পর জুন মাস পর্যন্ত যে তথ্য আমরা দেখছি, তাতেই অনেক বেড়েছে। আগামীতে কী হবে, উড়োজাহাজ আমদানি শুরু হলে কী হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।” তার মতে, আমদানি বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোও জরুরি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রফতানি বাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়ে ৩৫৯ কোটি ২৯ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে যা ছিল প্রায় ২৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বড় আমদানি উড়োজাহাজ
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি আরও বাড়ার বড় কারণ হতে পারে উড়োজাহাজ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছে।
এর মধ্যে ১৪টি উড়োজাহাজের জন্য করা চুক্তির মূল্য প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার। পরে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে উড়োজাহাজ আমদানির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য লেনদেনে বড় অঙ্ক যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সেবার আমদানিও বাড়তে পারে।
পোশাক রফতানিতে বিপরীত চিত্র
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি যখন দ্রুত বাড়ছে, তখন দেশটির বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির চিত্র তেমন ইতিবাচক নয়। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৯০৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আমদানির পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। তবে গড়ে প্রতি ইউনিট পোশাকের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৭১ শতাংশ।
এই সময়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে ২৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ভারত থেকে ২৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। পাকিস্তান থেকে কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম থেকে দশমিক ৭৬ শতাংশ। বিপরীতে ইন্দোনেশিয়া থেকে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং কম্বোডিয়া থেকে ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ থেকে আমদানি মূল্য কমেছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে কমেছে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে চাহিদা কমার পাশাপাশি সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। তবে আগস্টে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি ১১ শতাংশের বেশি বাড়া ইতিবাচক সংকেত।”
আমদানি বাড়ছে, কিন্তু ভারসাম্য কোথায়
চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় রফতানি আয়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে আমদানি ব্যয় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে রফতানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, হয়েছে ৮৩৮ কোটি ডলার। ফলে এ সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি ২৯ শতাংশ বেড়ে ৩৮২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর বড় কারণ জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি। এ সময়ে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৪৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১২৫ কোটি ডলার। তবে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির কারণে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত বেড়েছে। প্রথম দুই মাসে প্রবাসী আয় প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫৮৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
চীন-ভারতের বিকল্প নয়, বাড়ছে বৈচিত্র্য
বাংলাদেশের আমদানি বাজারে এখনও চীন ও ভারতের আধিপত্য রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। ভারত থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে ২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার।
তাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়লেও অল্প সময়ের মধ্যে চীন ও ভারতকে পেছনে ফেলে দেশটি বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস হয়ে উঠবে—এমন সম্ভাবনা দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “সাধারণ শিল্পপণ্য ও কাঁচামালের ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের অবস্থান শক্তিশালী। তবে এলএনজি, তুলা, কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বাড়তে পারে।” অর্থাৎ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন এলেও তা চীন বা ভারতের জায়গা পুরোপুরি দখলের চেয়ে আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার দিকেই বেশি এগোতে পারে।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির বাজারে রফতানিও বাড়ানো। কারণ আমদানি দ্রুত বাড়লেও রফতানি সে অনুপাতে না বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়বে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখা এবং উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজার বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।



























