সোমবার ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

মারিয়া সালাম

প্রকাশিত: ২৩:৪৩, ১ এপ্রিল ২০২৬

এপ্রিল ফুল

এপ্রিল ফুল
ছবি: সংগৃহীত

একদিন হঠাৎ মাঝরাতে বন্ধুর ফোন। ফিসফিস করে বলল, দোস্ত আমার বউয়ের জন্য শাড়ি কিনতে হবে। তুই কাল একটু সময় দিবি? 

এসব বিষয়ে তো আমার কোনো না নেই। আমি এক পায়ে খাড়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হঠাৎ এই ব্যাটা বউয়ের জন্য শাড়ি কিনতে চাচ্ছে কেন? যতদূর জানি, বউকে কোন উৎসব বা উপলক্ষ ছাড়া গিফট দেয়ার বান্দা সে না। বললাম, রহস্য কী? 

সে গলার স্বর আরও নিচে নামিয়ে বলল, আরে ঝগড়ার সময় মুখ ফস্কে বলে ফেলেছি, তোর দিকে তাকাতে ইচ্ছা করে না। তুই তো দেখতে বান্দরের মতো। 

কি সর্বনাশ! বান্দরের মতো দেখতে বউদেরই কেউ এটা বলার সাহস করে না, আর তুই রীতিমতো পরীর মতো দেখতে একটা মহিলাকে বান্দর বলে ফেলেছিল, তোর সাহসের সীমা-পরিসীমা নাই। শুধু শাড়িতে অপরাধ ক্ষমা হবে? 

বন্ধু বলল, আগে আয় তো, পরে দেখা যাবে।

পরের দিন মার্কেটে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে তাকে চিন্তিত মুখে সিগা রেট টানতে দেখে বুঝলাম পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। উদাস ভঙ্গিতে সিগা রেটের ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে সামনের দিকে তাকাল সে। হঠাৎ চোখেমুখে একটা ঝলমলে ভাব চলে এল, শরীরটা কেমন টানটান হয়ে গেল। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে আমিও সেদিকে তাকালাম। উত্তেজিত হবার মতো তেমন কিছুই দেখলাম না। এক কিশোরী এক বালতি ফুল নিয়ে বসে আছে আর দুইজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ফুলের দরদাম করছে। 

আমি ততক্ষণে ওর কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। আমাকে দেখে একমুহূর্ত দেরি না করেই সে বলল, তুই বললি না, শুধু শাড়িতে হবে না, এক বালতি ফুল সাথে দিলে কেমন হয়? আমি বললাম, দারুণ হয়। তুই এখানেই দাঁড়া বলে সে দ্রুত পায়ে ফুলের বালতির কাছে চলে গেল। তারপর... 

আমি ওর আচরণ দেখে নিজেই হতভম্ব হয়ে গেলাম। সে ধীর পায়ে সাদা শাড়ি আর উইগ পরা তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির পাশে গা ঘেঁষে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তাদের মধ্যে মুগ্ধ দৃষ্টি বিনিময় হতে দেখলাম। এতদিন জানতাম, সে নারীদের প্রতি কিছুটা বেশি উদার। কিন্তু, এখন ব্যাপারটা তৃতীয় লিঙ্গ পর্যন্ত চলে গিয়েছে, সেটা হজম করতে একটু কষ্ট হলো।

দৃষ্টি বিনিময়ের পর পরেই বন্ধু হঠাৎ চমকে উঠে বেশ দূরে ছিটকে গেল। সে অবস্থাতেই তাদের মধ্যে কিছু উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলো, আমার বন্ধু মানিব্যাগ খুলে একশো টাকার একটা নোট ব্যক্তিটির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে ফুল ছাড়াই ফেরত আসল। আমি কিছু বলার আগেই বলল, বুঝছিস, চোখের ডাক্তার দেখাতে হবে। কাছে গিয়ে দেখি সব ফুল বাসি, চল শাড়িটা কিনে ফেলি।

সাতদিন পরে আবার বন্ধুর ফোন। শোন শাড়িতে কাজ হচ্ছে না, বউ এখন ম্যারেজ কাউন্সিলর পর্যন্ত যেতে চায়। তোর পরিচিত কেউ আছে? 

অবশ্যই আছে। আমাদের বন্ধু স্থানীয়, তুই নিজেও চিনিস। তোর সাথে ফেবুতে আছে। নাম...

এটুকু শুনেই সে অধৈর্য হয়ে বলল, তুই ইমিডিয়েট ডেট নে, আগে আমি দেখা করতে চাচ্ছি, পরে দুইজন একসাথে গেলাম আর কি। তুই কিন্তু থাকবি, এসব ব্যাপার মেয়েরা ভালো বুঝে। 

এই গায়ে পড়া আন্টিটা কে রে? কেমন হেসে হেসে বলছে, আল্লা, ভাইয়া, আপনার মতো রোম্যান্টিক মানুষ যদি এরকম করে কীভাবে চলবে, কাউন্সিলিং সেরে বের হয়েই বন্ধু চিৎকার করে উঠল। এই কথা যদি আমার বউয়ের সামনে বলে তখন বুঝছিস কী হবে? আমি রোম্যান্টিক এটা এই জলহস্তি কীভাবে জানবে? 

এই একই প্রশ্ন আমারও, তুই রোম্যান্টিক এটা ভাবি কীভাবে জানবে? 

ভাবি মানে? মহিলা কে রে? 

কে আবার, আমাদের শফিকের নতুন বউ। 

বন্ধু লাফিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল, কোন শফিক? আমাদের শফিক? গতবছর যে বিয়ে করল, আমরা দাওয়াত পেলাম না, সে শফিক? 

হ্যা, বাপ, সেই। 

এরপর কি আবার আরেকটা বিয়ে করেছে ও? 

না, সেটা কেন হবে? মানুষ কি বছর বছর বিয়ে করে? 

এবার বন্ধু খুবই উত্তেজিত হয়ে বলল, আরে সেই মহিলা তো আমার ফেবুতে আছে। আমরা রেগুলার কথা বলি। মুখের সামনে ভাবির ফেসবুক ডিপি ধরে আবার বলল, তুই দেখতো কোন এঙ্গেল থেকে এই খালাম্মাকে তোর শফিকের বউ মনে হচ্ছে?

এবার ঝামেলাটা ধরতে পারলাম। স্থির কণ্ঠে বললাম, আরে এসব তো এআই দিয়ে তামিল নায়িকাদের বডিতে ভাবির ফেস বসিয়ে বানানো। কিছু কিছু বিউটি ফিল্টার মারা, কয়েকটাতে এআই দিয়ে লম্বা চুল করা। 

আরে শালা! ফিল্টার মারবি মার, তাই বলে এই বাটপারি! কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল, তোর কি মনে হয় এভাবেই শফিক ফেঁসে গেছে? এজন্যই মনে হয় বিয়েতে কাউরে ডাকে নি। 

আমারও সেটাই মনে হয়।

বন্ধু বিড়বিড় করে বলল, শালা, এখন মনে হচ্ছে নিজের বউ বাদে বাকি সবই ফিল্টার আর এআই। শালার পুরুষের জীবন মানে প্রতিদিনই এপ্রিল ফুল। 

নোট: বাংলাদেশের মানুষ যেদিন থেকে জেনেছে যে এপ্রিল ফুলস ডে ১৪৯২ সালে স্পেনের গ্রানাডায় মুসলমানদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এক ট্র্যাজেডি কেন্দ্র করে পালন করা শুরু হয়, তারা এটা উদযাপন বন্ধ করেছে। যদিও ঐতিহাসিক তথ্য ও দীর্ঘদিনের গবেষণায় এই দাবির কোনো সুনির্দিষ্ট ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি, তারপরেও বাঙালি মুসলমান অত্যাচারের গল্পটা বিশ্বাস করতে পছন্দ করে। ফলে, আগে ১ এপ্রিলের যে মজাটা ছিল, সেটা এখন আর নেই। আমাদের ছোটবেলায় যখন ফেসবুক ছিল না, তখন শিক্ষিত তরুণদের দেখতাম practical joke বা prank করতে। আমরাও করেছি, যেমন কারো বেডরুমের দরজার সামনে লালরং ফেলে রাখা, পিকনিকের কথা বলে বন্ধুদের ডেকে এনে না খেতে দিয়ে বিদায়, ইত্যাদি। মানুষ এসব করত নির্মল আনন্দ নিতে। তারপর দেশে এল ধর্মীয় মৌলবাদ, মানুষের আনন্দের সব অনুষঙ্গ কার্যত বিভিন্ন গুজবের নিচে চাপা পড়ে বিলীন হয়ে যেতে থাকল।

জনপ্রিয়