রোববার ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২

মারিয়া সালাম

প্রকাশিত: ১১:৫৮, ২৯ মার্চ ২০২৬

দুবলহাটী রাজবাড়ি

দুবলহাটী রাজবাড়ি
ছবি: সংগৃহীত

"দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।"

বাড়ির সামনেই আদিগন্ত সরিষা ক্ষেত। ঘুম থেকে উঠেই ইচ্ছা ছিল সরিষাক্ষেতে কিছু ছবি তুলি। বাড়ি থেকে বের হতে হতে মনে হলো হাতে বেশ সময় আছে, কাছাকাছি দুটি রাজবাড়ী দেখে সন্ধ্যায় আগেই ফিরে আসা যাবে। 

আত্রাই স্টেশন থেকে সিএনজি ভাড়া করে সোজা চলে গেলাম দুবলহাটি রাজবাড়ি। দুইশত বাইশ বছর পুরাতন এই রাজবাড়িটি নওগাঁ সদর উপজেলায় অবস্থিত। নওগাঁ শহর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে কোনরকমে দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল রাজবাড়িটির ধ্বংসাবশেষ। 

নওগাঁ সদর থেকে এখানে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে নামতে হবে বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে। বালুডাঙ্গা থেকে হাপানিয়া। হাপানিয়া থেকে ভ্যান বা অটো রিক্সায় দুবলহাটী রাজবাড়ি। আমি গিয়েছিলাম আত্রাই থেকে সিএনজি আটো ভাড়া করে। একঘণ্টার রাস্তায় রিজার্ভ আটো ভাড়া চেয়েছিল ছয়শো টাকা। আমি পাঁচশো টাকা দিয়েছিলাম, আরেকটু দরদাম করলে হয়তো আরো কম ভাড়াতে যাওয়া সম্ভব। 

আটো থেকে নেমেই প্রথমে চোখ যাবে প্রাসাদের সামনের ছোট্ট শিব মন্দিরটির দিকে, পাশ ঘেষেই বিশাল দীঘি। সেখানে এখন বানিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হচ্ছে বলে মনে হলো বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দেখে। দীঘির উল্টা পাশেই পাঁচ একর এলাকাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এই স্থাপনাটি। রক্ষণাবেক্ষণ আর যত্নের অভাবে ভবনটি পরিনত হয়েছে ধ্বংসস্তুপে। প্রাসাদটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের অথচ পাহারাদার বা রক্ষণাবেক্ষণকারী কাউকে চোখে পড়ল না। 

ভবনের সামনেই বিশাল প্রবেশদ্বার আর তার উপরে দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ। গথিক স্টাইলে নির্মিত ভারী পিলারের উপরে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় সাড়ে তিনশো কক্ষবিশিষ্ট এই প্রাসাদটি। সাত আঙ্গিনাবিশিষ্ট  এই প্রাসাদের ভিতর কোনদিকের ভবন তিনতলা আবার কোনদিকে চারতলা। একতলা থেকে আরেকতলায় যাবার জন্য রয়েছে চুনসুরকি নির্মিত প্যাচানো সিড়ি। নিচতলার ঢোকার মুখের ঘরটির মেঝেতে সিমিন্টের মিনাকারী কাজ আর বাকি স্থান বলতে গেলে সবটাই এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে সঠিক নকসা আর চোখে পড়ে না। প্রাসাদের অদূরেই একটি গুম্বুজ আকৃতির স্থাপনাও চোখে পড়ল, তবে সেটি প্রার্থনাঘর ছিল কিনা তা জানা গেল না। শোনা যায়, প্রাসাদটিতে একটি স্বর্ণ নির্মিত আর একট আইভরি নির্মিত সিংহাসন ছিল। ব্রিটিশরা সিংহাসন দু’টি নিয়ে যায়।

এই জমিদারির পত্তন নিয়ে আমার তেমন পড়াশোনা নাই। কথিত আছে রঘুনাথ নামের এক ব্যক্তি এ এলাকায় লবণ ও গুড়ের ব্যবসা করতেন। তিনি দীঘলি বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খয়রা নদী দিয়ে নৌকা যোগে দুবলহাটিতে ব্যবসার জন্য আসেন (বর্তমানে নদীর অস্ত্বিত্ব  আর নেই)। তিনি প্রায় প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখতেন তাঁকে কে যেন বলছে, “তুই যেখানে নৌকা বেঁধেছিস সেখানে জলের নিচে রাজ রাজেশ্বরী দেবীর প্রতিমা আছে। সেখান থেকে তুলে স্থাপন কর।” রঘুনাথ একদিন ভোরবেলা জলে নেমে দেখলেন সত্যিই সেখানে রাজ রাজেশ্বরীর প্রতিমা আছে। তিনি প্রতিমাটি জল থেকে তুলে একটি মাটির বেদী তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর তার ব্যবসায় ব্যাপক উন্নতি হতে থাকে।

এদিকে ঐতিহাসিকরা মনে করেন, দুবলহাটি জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা জগতরাম একজন লবণ ব্যবসায়ী, বাণিজ্য উপলক্ষে দুবলহাটির কাছের গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন এবং বিল অঞ্চলের ইজারা পত্তন গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তারা প্রচুর জমির মালিক হন। কথিত আছে যে, এই অঞ্চলে তেমন কোন ফসল উৎপন্ন না হওয়ায় ভুমা মহল অজুহাতে দুবলহাটির জমিদার কই মাছ দিয়ে কর পরিশোধ করতেন। মাত্র ২২ কাহন কই মাছ কর হিসেবে দিতেন। রঘুনাথের বিত্ত-বৈভবের খবর পৌঁছে যায় মোগল দরবারে। মোগল দরবারের নির্দেশে তাকে ডেকে পাঠানো হয় মুর্শিদাবাদ নবাবের দরবারে। নবাব তাকে রাজস্ব প্রদানের নির্দেশ জারি করেন। তিনি নবাবকে জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেখানে শুধু জল আর জল। কোন ফসল হয় না। তবে বড় বড় কৈ মাছ পাওয়া যায়। বিষয় বুঝতে পেরে নবাব তাকে প্রতি বছর রাজস্ব হিসাবে ২২ কাহন কৈ মাছ প্রদানের নির্দেশ দেন।

তবে, দুবলহাটি জমিদারি বৃহত্তর রাজশাহী জেলার জমিদার পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী তার বিভিন্ন জনহিতকর কাজের জন্য দুবলহাটি জমিদারদের মধ্যে বিখ্যাত হয়ে আছেন। ১৮৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে তার জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ডের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে রাজা এবং ১৮৭৭ সালে রাজা বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করে। ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দ এর দিকে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি হওয়ার পর রাজা হরনাথ রায় সপরিবারে চলে যান ভারতে।