স্বপ্নে বিজ্ঞাপন কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ, পিআর ম্যানেজার সাময়িক বরখাস্ত
দেশের সুপরিচিত রিটেইল চেইন স্বপ্ন–এর বিজ্ঞাপন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর ম্যানেজার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলু–কে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে এবং বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বিজ্ঞাপন প্রকাশের কাজ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে দেওয়ার সময় বিল অনুমোদনের শর্ত হিসেবে অগ্রিম কমিশন দাবি করা হতো। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে একটি নিয়মিত চাঁদাবাজির রূপ নেয়, যেখানে বিজ্ঞাপন কাজ পাওয়ার পাশাপাশি বিল ছাড় করাতেও কমিশন দিতে বাধ্য করা হতো।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিভিন্ন পত্রিকা, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর বিল পাস করাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিশন দাবি করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, বিজ্ঞাপনের মোট বিলের প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম কমিশন দিতে বলা হতো। অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থ আগে পরিশোধ না করলে বিল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হতো বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
একাধিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পাওয়া যেত না। বরং বিল ছাড় করাতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হতো। বাধ্য হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান এই অনৈতিক শর্ত মেনে নিত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, পরিস্থিতি কার্যত চাঁদাবাজির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব আর্থিক লেনদেন অনেক সময় অফিসের ভেতরেই প্রকাশ্যে আলোচনা হতো। কেউ কমিশন দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি তুললে তাকে জানানো হতো যে, এই অর্থ কেবল একজনের জন্য নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকেও এর অংশ দিতে হয়।
এক ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিল অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয় এবং সেই কারণেই কমিশনের টাকা বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বণ্টন করা হয় বলে দাবি করা হতো। ফলে কমিশন না দিলে বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হতো।
এদিকে অভিযোগ সামনে আসার পর করপোরেট সুশাসন ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের সুনামকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে এ ধরনের অনিয়ম করপোরেট খাতের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ.সি.আই. লজিস্টিকস লিমিটেড–এর অধীনে পরিচালিত স্বপ্ন সবসময় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কর্পোরেট সুশাসনের নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিডিয়া অ্যান্ড পিআর ম্যানেজার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলু গত ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইমেইলের মাধ্যমে মানবসম্পদ বিভাগকে পদত্যাগপত্র দেন এবং দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে তার দায়িত্বকালীন সময়ে সম্ভাব্য কিছু আর্থিক অসংগতির প্রাথমিক তথ্য পাওয়ায় বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির এর সঙ্গে ২০২৪ সালের রমজান মাসে তেজগাঁও কার্যালয়ে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের এক সভায় বিজ্ঞাপন ও জনসংযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম জানানো হয়েছিল।
স্বপ্ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে বিজ্ঞাপন, জনসংযোগ বা সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে যোগাযোগের জন্য মিডিয়াকে মো. আতিকুর রহমান অথবা মো. মাহাদী ফয়সাল–এর সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
উল্লেখ্য ২০২৪ সালেও তার নামে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেসময় রমজানের শেষ দিকে কয়েকজনের কাছে কমিশনের বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।



























