কাগজে-কলমে স্বাস্থ্যসেবা, বাস্তবে ২ মাস ধরে বন্ধ ধনীপাড়া ক্লিনিক
গ্রামের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল কমিউনিটি ক্লিনিক। উদ্দেশ্য ছিল, অসুস্থ মানুষ যেন সামান্য চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য দূর-দূরান্তে ছুটতে বাধ্য না হন। অথচ সেই সেবার দুয়ারেই এখন ঝুলছে তালা। চিকিৎসার প্রত্যাশা নিয়ে এসে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে মানুষকে।
গতকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল ১১টার দিকে সরেজমিনে ক্লিনিকটিতে গিয়ে দেখা যায়, সেবাকেন্দ্রটির দরজায় তালা ঝুলছে। চারপাশে নীরবতা, অথচ এই দরজার ওপাশেই থাকার কথা ছিল মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার আশ্রয়স্থল।
এমনই চিত্র পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের ধনীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই মাস ধরে ক্লিনিকটি সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে এলাকার অসহায় ও সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁদের ন্যূনতম প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে।
ক্লিনিকটির দায়িত্বে থাকা কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মোঃ সারোয়ার আলমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগ করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, ঠাকুরগাঁও থেকে বদলি হয়ে আসার পর থেকেই তিনি নিয়মিত ক্লিনিকে উপস্থিত থাকতেন না। কখনো বেলা ১১টার পর এলেও এক থেকে দেড় ঘণ্টার বেশি অবস্থান করতেন না। ফলে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে অনেক রোগীকে তালাবদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফিরে যেতে হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ক্লিনিকটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারীকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ক্লিনিকের সামনের সড়কে পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনায়ও তৈরি হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
এ বিষয়ে সিএইচসিপি মোঃ সারোয়ারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি অফিসেই রয়েছেন এবং পঞ্চগড় জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাজিরা দিয়েছেন।
অন্যদিকে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আফরোজা রিনা জানান, সিএইচসিপির অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে তিনি অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর হাজিরা খাতা নিজ দপ্তরে রেখেছেন। সেখান থেকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে তাঁকে ক্লিনিকে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি নিজে একাধিকবার সরেজমিনে পরিদর্শন করেও তাঁকে ক্লিনিকে উপস্থিত পাননি। এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে একাধিকবার চিঠি ও শোকজ পাঠানো হয়েছে এবং বিভাগীয় তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান জানান, ধনীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপির বিষয়ে তিনি বিস্তারিত অবগত হয়েছেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা সিএইচসিপির বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগও করেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একটি কমিউনিটি ক্লিনিক শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়, এটি গ্রামের অসুস্থ মানুষের ভরসা, দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসা পাওয়ার শেষ আশ্রয়গুলোর একটি। সেখানে দিনের পর দিন তালা ঝুলে থাকা মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ থাকা নয়, বরং চিকিৎসার প্রত্যাশায় থাকা অসংখ্য মানুষের অধিকার ও আস্থার জায়গাটি সংকুচিত হওয়া।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, সরকারি অর্থে নির্মিত এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র যদি মানুষের প্রয়োজনের সময়ই বন্ধ থাকে, তবে এর সুফল পাবে কারা? তাঁরা দ্রুত ক্লিনিকটি নিয়মিত চালু, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।



























