শনিবার ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫:৩১, ৪ জুলাই ২০২৬

বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং প্রকল্পে লুটপাটের মহোৎসব

নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের সিন্ডিকেটে জিম্মি নৌপথ

নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের সিন্ডিকেটে জিম্মি নৌপথ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগে নদী খননের নামে বছরের পর বছর চলছে শত শত কোটি টাকার লুটপাট, এমন অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ড্রেজার অচল রেখে বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া, জ্বালানি তেল আত্মসাৎ, ভুয়া লগবই, একই স্থানে বারবার ড্রেজিং দেখিয়ে বিল উত্তোলন এবং মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সরকারি অর্থ লোপাট করছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদ, এমন অভিযোগও উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ভোলা-লাহারা-বরগুনা-আমতলী-পটুয়াখালী-বরিশাল সদর নৌপথে ড্রেজিং কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে নৌপথের নাব্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বরং খনন করা বালু ও পলি নদীর তীর থেকে নিরাপদ দূরত্বে না ফেলে মাঝনদীতেই ফেলে রাখা হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার স্রোতে সেই পলি আবার আগের স্থানে ফিরে আসায় একই জায়গা বারবার খনন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ড্রেজিং বিভাগের সবচেয়ে বড় দুর্নীতির খাত জ্বালানি তেল। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় ড্রেজার সচল না থাকলেও ভুয়া লগবই তৈরি করে হাজার হাজার লিটার ডিজেল ব্যবহারের হিসাব দেখানো হয়। বাস্তবে ড্রেজার না চললেও সরকারি জ্বালানি আত্মসাৎ করে সেই অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব ড্রেজার বহর থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘদিন অচল রেখে বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কমিশনভিত্তিক সমঝোতার মাধ্যমে সরকারি কাজ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে কাজ না করেই ভুয়া পরিমাপ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল অনুমোদনের অভিযোগও উঠেছে।

ড্রেজার মেরামতের ক্ষেত্রেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিম্নমানের কিংবা পুরোনো যন্ত্রাংশ নতুন হিসেবে দেখিয়ে বিপুল অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও কোনো যন্ত্রাংশ না কিনেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে ড্রেজিং বিভাগের গুদামে থাকা মূল্যবান তামা, পিতল ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ পাচারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

ড্রেজিং বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভাগজুড়ে দুর্নীতির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। কেউ অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকে বদলি অথবা বিভাগীয় শাস্তির ভয় দেখানো হয়। জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন খাত থেকে আদায় হওয়া অর্থ নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত ভাগ হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও নৌপথের নাব্যতা ফিরছে না। বরং পদ্মা, যমুনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়মিত নৌযান আটকে পড়ছে। এতে ব্যবসায়ী ও নৌযান মালিকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

এ বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ড্রেজিং প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি তদন্তের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি সূত্র জানিয়েছে, ড্রেজিং প্রকল্পের নথিপত্র সংগ্রহ করে অভিযোগগুলো যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদের অনুসন্ধানও করা হবে।

নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ড্রেজিং প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ লুটপাট বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তাদের দাবি, পুরো ড্রেজিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষা করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তবে নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

জনপ্রিয়