রোববার ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:৩৩, ২৯ মে ২০২৬

জব্দ ব্যাংক হিসাব থেকে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

জব্দ ব্যাংক হিসাব থেকে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নির্দেশনা উপেক্ষা করে জব্দ করা ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাংকিং খাত ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পের আওতায় দুই দফায় মোট ৪৮ কোটি টাকা বিল বাবদ মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। প্রতিটি ধাপে ২৪ কোটি টাকা করে এই অর্থ ছাড় করা হয় বলে জানা গেছে।

তবে এর আগেই সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে দুদক ও বিএফআইইউ মাসুদ আলম, তার স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক খাতের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় ৩০ জুন ও ৩০ সেপ্টেম্বরভিত্তিক বিলের অর্থ কৌশলে উত্তোলন করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা সাবেক সচিব মেজবাহ উদ্দিনের কাছে পাচার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ঘটনায় সিআর মামলা নং-৪৯৯/২০২৫ দায়ের করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩২৬, ৩০৭, ১১৪ ও ১০৯ ধারাসহ বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিভিন্ন ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি নির্দেশে জব্দ করা হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। তাদের মতে, প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতা ছাড়া এমন ঘটনা সম্ভব নয়।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ৩০০ কোটি টাকার একটি সরকারি প্রকল্প পেতে বর্তমান যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার তৎকালীন এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল হামিদ খানের বিরুদ্ধেও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব, ঘুষ ও উচ্চপর্যায়ের তদবিরের মাধ্যমে গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

জানা গেছে, মাসুদ আলম একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত জুলাইয়ে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তার বিরুদ্ধে উসকানি, হত্যা ও সরকারি সম্পদ ধ্বংসের অভিযোগে প্রায় ৭০টি মামলা দায়ের হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নতুন সরকারের আমলেও তিনি প্রকল্প কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যা প্রশাসনের ভেতরেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ব্যবসায়িক অঙ্গনে মাসুদ আলম ‘প্রমিস গ্রুপ’-এর কর্ণধার হিসেবে পরিচিত। এর আগে ‘নগদহাট বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে একটি এমএলএম ব্যবসার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পরবর্তীতে ‘প্রমিস মার্ট’, ‘প্রমিস অ্যাসেট’, ‘প্রমিস টেক’সহ অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।

২০২৪ সালের এপ্রিলে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় জমা দেওয়া হলফনামায় মাসুদ আলম তার নিট সম্পদের পরিমাণ দেখান ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা। সেখানে তার বার্ষিক আয় উল্লেখ করা হয় মাত্র ২১ লাখ টাকা।

তবে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, তার প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ ঘোষিত তথ্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ গোপন রাখা হয়েছে।

ইতোমধ্যে দুদক মাসুদ আলম ও তার স্ত্রীর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পাশাপাশি দেশের সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চিঠি পাঠিয়ে তাদের সম্পদের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

প্রমিস গ্রুপের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড’-এর দাপ্তরিক ফোন নম্বরগুলো বন্ধ রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমও অনেকটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে।

আইটি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আগে থেকেই ভুয়া বিল-ভাউচার, নিম্নমানের প্রশিক্ষণ এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। এরপরও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানটিকে শতকোটি টাকার প্রকল্প দেওয়া এবং জব্দ হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।

দুদক ও বিএফআইইউ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কীভাবে জব্দ করা হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করা হলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদও চলছে।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়