প্রতিদিন ১০টির বেশি হত্যা, বাড়ছে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ
দেশজুড়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সশস্ত্র সহিংসতা। রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং পুরোনো অপরাধী চক্রগুলোর পুনরুত্থানের প্রেক্ষাপটে বাড়ছে খুন, বন্দুক হামলা ও টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা। দিনের আলোয় সংঘটিত একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং প্রকাশ্য গোলাগুলির ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠী। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং শীর্ষ অপরাধীদের মুক্তি বা দেশে ফিরে আসা সহিংসতার মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালের একই সময়ে মোট ৯৯৩টি মামলা হলেও এর মধ্যে ২২৬টি ছিল আগের ঘটনার জের ধরে দায়ের করা। সে হিসেবে প্রকৃত সংখ্যা ছিল ৭৬৭। ২০২৪ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৭৯৪।
ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে—২০৭টি। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১৮৬টি, রাজশাহীতে ১০৬টি এবং খুলনায় ৮৪টি। মহানগর এলাকাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকা মহানগরে।
ক্রমবর্ধমান সহিংসতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা খায়রুল হাসান বলেন, আমরা মোটেও নিরাপদ বোধ করছি না। খুন, গোলাগুলি আর ছিনতাই নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
সর্বশেষ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার একটি জনবহুল বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশায় করে আসা কয়েকজন অস্ত্রধারী খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শুধু রাউজানেই অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সময়ে শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষ।
গত ১ মে থেকে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ১৮ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল গ্রেপ্তার অভিযান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট নয়।
টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর পেছনে পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন না করাকে দায়ী করেন তিনি।
অধ্যাপক ফারুক উল্লেখ করেন, থানা থেকে লুট হওয়া এক হাজারেরও বেশি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানও অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া অনেক অপরাধী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে।
ওমর ফারুকের ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয় অবস্থানের সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। তাদের ধারণা, অপরাধ করলেও সহজে পার পাওয়া যাবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে অপরাধীদের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে ভেস্তে গেছে। ফলে পুলিশের জবাবদিহিতা ও পেশাদারত্বের জায়গাটা উন্নত হয়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কয়েকজন কুখ্যাত গ্যাং লিডার ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী মুক্তি পেয়ে কিংবা বিদেশ থেকে ফিরে এসে আবার সক্রিয় হয়েছেন। হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধার এবং পুরোনো শত্রুতার প্রতিশোধ নিতেই তারা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন।
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পুরোনো বিরোধগুলোও নতুন করে সামনে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় একের পর এক হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার শতাধিক ঘটনায় অন্তত ২৯ জন নিহত এবং প্রায় ১ হাজার ৭৩৪ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বহু ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
সংগঠনটির দাবি, এসব ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশে বিএনপির নেতা-কর্মীরা হয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, নয়তো সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের জড়তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। প্রতিটি ঘটনার তদন্তে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি এবং ইতিবাচক ফলও পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীরা বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থার ভয় পেত। বর্তমানে পুলিশ মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে কাজ করছে।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুধু পুলিশের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনেক কারণ জড়িত। তবে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের ছাড় না দিতে সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং পুলিশকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার



























