নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান
মাত্র ১৫ বছরের সরকারি চাকরি। পদমর্যাদায় অষ্টম গ্রেডের একজন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)। কিন্তু এই স্বল্প সময়েই গড়ে তুলেছেন ঢাকা, রংপুর ও কুড়িগ্রামজুড়ে বিলাসবহুল বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গাড়ির বহর এবং কোটি কোটি টাকার ব্যাংক লেনদেন। অভিযোগ রয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান সরকার সরকারি প্রকল্পের অর্থ লুটপাট, বদলি বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মনিরুজ্জামানের বৈধ চাকরিজীবনের সম্ভাব্য আয় ৯০ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ তার ও পরিবারের নামে দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কারও আয়-সম্পদের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্তের বিষয়। তদন্তেই বেরিয়ে আসবে সম্পদের প্রকৃত উৎস।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সুপারিশে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে চাকরিতে প্রবেশ করেন মনিরুজ্জামান সরকার। পরবর্তীতে অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ হয়ে সারাদেশের পিআইওদের বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
২০১১ সালের ৭ জুলাই ঠাকুরগাঁওয়ের বোদা উপজেলায় অ্যাডহক ভিত্তিতে পিআইও হিসেবে যোগদানের পর ছয় মাসের মাথায় স্থায়ী নিয়োগ পান। এরপর দিনাজপুরের কাহারোলে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে প্রথম অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং তৎকালীন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোতাহার হোসেনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ভাগাভাগির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হতো। মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগও প্রভাব খাটিয়ে নিষ্পত্তি করা হতো বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার মিরপুর রূপনগরের এবিসি হোমসে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও কার পার্কিং কেনেন তিনি। এছাড়া রংপুর নগরীর রাধাবল্লভ এলাকায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের তিনতলা বাড়ি, কলেজ রোডে তিন কোটি টাকার ছাত্রাবাস, রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্লট, কুড়িগ্রামের চিলমারী ও উলিপুরে একাধিক জমি, নিজ এলাকায় দোতলা বাড়ি এবং স্ত্রী আরফাতুন নাহারের নামে আরও কয়েকটি সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া কুড়িগ্রাম শহরের শাপলা চত্বরে কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বড় ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা, ভাড়ায় পরিচালিত ছয়টি মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অর্ধকোটি টাকার গাড়ি এবং তেলের পাম্প ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, স্ত্রী ও স্বজনদের নামেও একাধিক সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মনিরুজ্জামান ও তার স্ত্রীর নামে এনআরবিসি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকে একাধিক হিসাব রয়েছে। এসব হিসাবে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ। অবৈধ অর্থ বৈধ করার জন্য ব্যাংক ঋণেরও আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে প্রায় ১০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ আসে। অভিযোগ, এসব প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। বিষয়টি তদন্তে গেলেও তা শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুকুরেরহাট ডিগ্রি কলেজ ও শুকুরেরহাট ইসলামিয়া আলিম মাদরাসার উন্নয়ন প্রকল্পেও বরাদ্দের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প চেয়ারম্যানরা স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, সরকারি বরাদ্দের পুরো অর্থ তারা পাননি।
এছাড়া রাস্তা সংস্কার, মসজিদ, ঈদগাহ, মাটি ভরাট, উপজেলা পরিষদ উন্নয়নসহ অন্তত ৩০টির বেশি প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অনেক জনপ্রতিনিধির দাবি, তাদের অজান্তেই প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অফিস উন্নয়নের নামে বরাদ্দ নেওয়া লাখ লাখ টাকারও কোনো বাস্তব ব্যবহার হয়নি। এমনকি কম্পিউটার কেনার নামে একাধিকবার বরাদ্দ নিয়ে সরঞ্জাম না কেনার অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো, টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে অর্থ ফেরত দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশের কাজ বাস্তবায়ন না করেই বিল ছাড় করা হয়েছিল।
এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালকের (এপিডি) দায়িত্ব পালনকালেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, বিপুল সম্পদের উৎস, ব্যাংক লেনদেন এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুদক, এনবিআর ও বিএফআইইউর সমন্বিত তদন্ত হলে মনিরুজ্জামান সরকারের সম্পদের প্রকৃত উৎস এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।



























