শনিবার ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৪৮, ২৯ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা : বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা : বিশ্বব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের অভিঘাত সরাসরি অনুভূত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে দেখা দিয়েছে গ্যাসের সংকট। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ইউরিয়া সার উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। বাড়ছে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ, যার প্রভাব ধীরে ধীরে পড়ছে পণ্যের দাম, কৃষি, মানুষের আয়-রোজগার এবং কর্মসংস্থানে।

সংকট আরও দীর্ঘায়িত হলে দেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকা মানুষের সংখ্যাও যুদ্ধের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের এসব সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে ওই মূল্যায়ন করা হয়।

তবে নতুন এই সংকট এমন সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি আগে থেকেই নানা চাপে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে দেশে কাঙ্ক্ষিত হারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ সংঘাতের কারণে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা হারাতে পারেন।

এ বছর দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে মূল্যবৃদ্ধির অবদান প্রায় ১০ শতাংশ হতে পারে বলেও মনে করছে বিশ্বব্যাংক। জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ধাপে ধাপে ভোক্তাদের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও ০.৫ শতাংশের বেশি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খরচই বাড়বে না, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে গিয়ে পড়বে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য সম্প্রতি জানিয়েছেন, জুলাইয়ে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। তাঁর ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমে আসত।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাবগুলোর একটি পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। অথচ ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় দেশে গ্যাসের উৎপাদন ইতোমধ্যে ১৫ শতাংশ কমে গেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি। বাংলাদেশের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকেই ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সময়ে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

সংকট সামাল দিতে সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি মূল্য দিতে হয়েছে।

জ্বালানির বাড়তি দামের আরেকটি বড় চাপ পড়তে পারে সরকারি বাজেটে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির পরিমাণ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। এতে সরকারের অন্যান্য খাতে ব্যয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকছে না শিল্পখাতে; কৃষিও এর বাইরে নয়। বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সার উৎপাদন কিংবা আমদানিতে সমস্যা তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা।

দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু সার উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান গ্যাস। গ্যাসের সংকটের কারণে এরই মধ্যে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার পাঁচটিকে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

অন্যদিকে ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, জ্বালানি ও সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সারের দাম দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বাজারেও নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবার ওপরও। বাংলাদেশে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশাপাশি রয়েছে প্রায় ছয় হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক।

বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে তাদের জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে।

শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানি নয়, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের কাঁচামালের ক্ষেত্রেও রয়েছে আমদানিনির্ভরতা। দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর।

ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট দেখা দিলে কিংবা জাহাজভাড়া বেড়ে গেলে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের খরচও বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের ওপর ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোনো কোনো কারখানায় কাজের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনাগুলো পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করছে। বিশ্বব্যাংকের প্রায় ৬ লাখ মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা সেই বাস্তবতাকে আরও পরিষ্কার করে তুলেছে।

অর্থনীতিতে এমনিতেই যখন মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও সীমিত সরকারি আর্থিক সক্ষমতার চাপ রয়েছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন করে একাধিক খাতে ঝুঁকি তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য কেবল জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ার বিষয় নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবায়। যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর সবচেয়ে বড় চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়তে পারে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।

সম্পর্কিত বিষয়:

জনপ্রিয়