জাতীয় নির্বাচনের পর বাকৃবি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের পর শিক্ষার্থীরা আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হবে সন্ত্রাসমুক্ত, শিক্ষাবান্ধব ও গণতান্ত্রিক। তারা চায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, যেখানে ক্লাস, ল্যাব ও প্র্যাকটিক্যাল কার্যক্রম নিয়মিত এবং ফলপ্রসূভাবে পরিচালিত হবে।
শিক্ষার্থীরা আরও চায় হাতে-কলমে শেখার সুযোগ, গবেষণা ও প্রযুক্তি দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রজেক্টভিত্তিক কাজ এবং ফিল্ডওয়ার্কের সুযোগ বাড়ানো। পাশাপাশি, খাবারের মান উন্নয়ন, হলের সুবিধা বৃদ্ধি এবং যাতায়াত ব্যবস্থার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়ে,
কৃষি অনুষদের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী মোমতাহিনা বলেন ২০২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশ- এর রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও দলীয় আধিপত্য শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নতুন বাস্তবতায় আশা করা যায়, ক্যাম্পাসে সুস্থ ও গঠনমূলক রাজনৈতিক চর্চা প্রতিষ্ঠিত হবে।
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এমন কিছু পরিবর্তন দেখতে চাই, যা আমাদের প্রজন্মকে দক্ষ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে হাতে-কলমে শেখা, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর-এর অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন দরকার।
শুধু লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে প্রেজেন্টেশন, গ্রুপ ডিসকাশন ও প্রকল্পভিত্তিক কাজের ওপর জোর দিলে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও বাস্তব দক্ষতা বাড়বে। সবশেষে, আমাদের প্রত্যাশা একটি ভীতিমুক্ত, বন্ধুত্বপূর্ণ ও শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস, যেখানে শিক্ষা হবে শুধু সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং দেশের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ভিত্তি।
পশু পালন অনুষদের শিক্ষার্থী মুক্তাদির বলেন , পরিবারের বাইরের পরিবেশে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারপ্রাপ্তি এখন বড় একটি সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। দেহের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার অপরিহার্য। আবার অস্বাস্থ্যকর- অনিরাপদ খাবার থেকে প্রাণঘাতী রোগও হতে পারে। নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় বাকৃবিতে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা করানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবে আমরা খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি না। বাকৃবি ক্যাম্পাসের হোটেলগুলোতে খাবারের মান ও মূল্য নিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি সাধারণ অভিযোগ সবসময়ই থাকে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বর্তমান ও ভবিষ্যতে নিরাপদ স্বাস্থ্যের কথাটি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টদের প্রতি খাবারের মান ও পরিবেশ উন্নয়নে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহনের প্রত্যাশা থাকবে।পাশাপাশি খাবারের মূল্য শিক্ষার্থীবান্ধব পর্যায়ে নামিয়ে আনার অনুরোধ থাকবে।
কৃষি অর্থনীতি অনুষদের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিমা জান্নাত বলেন, বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্রী হলেই আবাসন সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আসনসংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে এখনো প্রায় প্রত্যেকটি হলেই মেয়েদের গণরুমে থাকতে হচ্ছে। কিছু কিছু হলে গণরুমে থাকার সময়সীমা চার-পাঁচ মাস হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা এক বছরও পেরিয়ে যায়। আবার কিছু হলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদেরও ডাবলিং করে থাকতে হয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই স্বপ্ন থাকে—নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন হল, নিজের একটি বিছানা ও পড়ার টেবিল। কিন্তু বাস্তবে এখন বিছানা ও পড়ার টেবিল পর্যন্ত ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এছাড়া সব মেইন হলে রান্নার কিছু ব্যবস্থা থাকলেও অ্যানেক্স ভবনে সেই সুযোগও নেই। পানির সংকট, খাবারের নিম্নমান এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করছে। হল প্রশাসনের উচিত এসব বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া। নিয়মিত তদারকি, সুষ্ঠু আসন বণ্টন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
কৃষি অর্থনীতি অনুষদের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতিন নুর তাকী বলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষের জন্য ক্যাম্পাসে ভৌত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিশাল আয়তনের উন্মুক্ত এই ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং যানজটমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা কতৃপক্ষের মূল দায়িত্ব। প্রধান সড়কগুলোতে উচ্চগতির মোটরসাইকেল ও বাইক রেসিং বন্ধ রাখতে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে, পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
নারী শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় ২৪ ঘণ্টা জরুরি হেল্পলাইন এবং সান্ধ্যকালীন বিশেষ নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করা অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, সাইকেলসহ ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষায় প্রযুক্তিগত তদারকি ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য 'কুইক রেসপন্স টিম' গঠন করা প্রয়োজন।
মোটের ওপর, শিক্ষার্থীরা চাইছে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ এবং ভীতিমুক্ত পরিবেশ, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে পড়াশোনা, গবেষণা ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে-একটি সত্যিকারের ‘সুরক্ষিত দুর্গ’ হিসেবে।
কৃষি অর্থনীতি অনুষদের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো আরও গণতান্ত্রিক, সহনশীল এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে পরিচালিত হবে- এমন প্রত্যাশাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে বিরাজমান কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতি, বিশেষত গেস্ট রুম নির্ভর নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভীতির পরিবেশ, আর ফিরে না আসুক- এটি এখন শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক দাবি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এমন একটি ক্যাম্পাস চায়, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে এবং ভয় বা চাপ ছাড়াই নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে সক্ষম হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় বড় স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু নতুন পরিবেশ, বিশেষ করে বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে এসে হঠাৎ ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার চাপে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সময় যদি গেস্ট রুম বা অনুরূপ চাপ সৃষ্টিকারী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তবে তাদের এবং তাদের পরিবারগুলোর লালিত স্বপ্ন সহজেই ভেঙে যেতে পারে। সুতরাং, একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।



























