নির্বাচন ঘিরে তরুণদের আশাবাদ-উদ্বেগ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৎপরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তরুণ ভোটাররা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৪৪ লাখ। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ। চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদ শেষে আরও প্রায় ৫৭ লাখ তরুণ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মোট তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটিতে পৌঁছাতে পারে, যা মোট ভোটারের প্রায় ৩০ শতাংশ।
এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তরুণ সমাজের আশাবাদ ও শঙ্কার মাত্রা জানতে তরুণ ও তরুণী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছে সংবাদ পরিক্রমা ।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও ঢাকা জজ কোর্টের শিক্ষানবিশ আইনজীবী মেহেদী হাসান সাকিব বলেন,
" জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছিল। তাঁর মতে, বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হওয়ায় তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে আশাবাদী। তবে ভোটের দিন কেন্দ্রভিত্তিক অনিয়ম, জাল ব্যালট কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নির্ভর করবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। আইন দিয়ে পরিবর্তন নিশ্চিত করা কঠিন হলেও যে দলই ক্ষমতায় আসুক, কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ বলেন, দেশের একটি বড় অংশ তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। তাঁর মতে, এটি শুধু ভোট দেওয়া নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তিনি বলেন, তরুণদের ভোটের মাধ্যমেই ভবিষ্যতে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে, তা নির্ধারিত হবে।"
সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম খলিল হৃদয় বলেন, " বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আশা ও সন্দেহ একসঙ্গে থেকেছে। তাঁর মতে, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহনশীলতা নিশ্চিত হলে এই নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক পথ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।"
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আল হাদী বলেন, "অতীতের অভিজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা তৈরি করলেও বর্তমানে রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে। তিনি নির্বাচন কমিশনের কিছু কার্যক্রম এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আস্থার সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও তা নির্ভর করবে নির্বাচিত নেতৃত্ব সংস্কারে কতটা আন্তরিক তার ওপর।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন যদি জনমতের সঠিক প্রতিফলন না ঘটে, তবে তরুণ সমাজ নীরব থাকবে না এবং তারা গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় প্রতিবাদ জানাতে পারে বলে তিনি মনে করেন।"
পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ বলেন, ❝দেশের প্রায় সাড়ে চার কোটি তরুণ প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। আমি নিজেও সেই সৌভাগ্যবানদের একজন—প্রথমবার ভোট দেবো। এই ভাবনাটাই আমাকে ভীষণভাবে পুলকিত করে। কারণ এটা শুধু একটি ভোট দেওয়া নয়, এটা নিজের নাগরিক দায়িত্ব পালন করার প্রথম বড় পদক্ষেপ।
আর সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো—আমরা কেবল ভোটারই নই, আমরা ইতিহাসেরও সাক্ষী হতে যাচ্ছি। একটি গণভোটের সাক্ষী হওয়া মানে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরাসরি অংশ নেওয়া।
আমরা যারা প্রথমবার দেশের পরিবর্তনের জন্য ভোট দেবো, আমাদের কাঁধে একটি বড় দায়িত্ব। আমাদের ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশ—ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। তাই আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে; ভয় নয়, সাহস নিয়ে; লোভ নয়, আদর্শকে সামনে রেখে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই প্রথম ভোট যেন শুধু একটি দিনের ঘটনা না হয়, বরং সারাজীবনের জন্য দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে ওঠার শপথ হয়—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।❞
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া মিম বলেন, " তিনি নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী। তবে নির্বাচন প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে তরুণ সমাজ নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করবে বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, এই নির্বাচন তরুণদের রাজনৈতিক আস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
একই প্রসঙ্গে তরুণ শিক্ষার্থী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, আমি মনে করি, তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে একজন যোগ্য জনপ্রতিনিধিকে নির্বাচন করা। কারণ জেন জি ভোটারের সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অথচ আমরা এখনো প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাইনি। এত বড় একটি ভোটব্যাংক কোন পক্ষের দিকে যাবে, তা এখনো নির্দিষ্ট নয়। এই বাস্তবতা এবারের নির্বাচনকে ভিন্ন মাত্রা দিচ্ছে।
তরুণদের ভোট এই নির্বাচনে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করার সক্ষমতা রাখে। এটি শুধু একটি ভোট নয়; এটি তরুণ সমাজের প্রত্যাশা, ক্ষোভ ও ভবিষ্যৎ ভাবনার প্রতিফলন।
তবে নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হয়, তরুণ সমাজ আর নীরব থাকবে না। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—তরুণরা তাদের অধিকার আদায়ে ভয় পায় না। কেউ যদি আবার স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তরুণ সমাজ সেই প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করবে।
একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি—তরুণদের রক্ত কোনোভাবেই সস্তা নয়। বারবার রাজনৈতিক ব্যর্থতা বা ক্ষমতার লড়াইয়ের মূল্য তরুণদের রক্ত দিয়ে দেওয়া যাবে না। তরুণ সমাজ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, প্রকৃত ও টেকসই পরিবর্তন চায়।”
সব মিলিয়ে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তরুণদের কাছে শুধু ক্ষমতার পালাবদলের বিষয় নয়। ভোটাধিকার, রাজনৈতিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তাদের প্রত্যাশা ও শঙ্কা—দুটোই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এই কথোপকথনে। তরুণদের একটি বড় অংশ এই নির্বাচনকে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখছে।



























