রোববার ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৩২, ১১ জানুয়ারি ২০২৬

ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেই ইরানে নতুন করে বিক্ষোভ

ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেই ইরানে নতুন করে বিক্ষোভ
ছবি: সংগৃহীত

ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার মধ্যেই শনিবার রাতে ইরানের রাজধানী তেহরানের রাস্তায় ফের সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বিক্ষোভকারীরা। প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের পরও গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরালোভাবে অব্যাহত রয়েছে।

দুই সপ্তাহ আগে তেহরানে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তা দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের দাবিতে রূপ নেয়। ইরান সরকার এই বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী সহিংস দমন-পীড়নে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজন মানুষ নিহত হয়েছেন। শনিবার এসব সংস্থা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

বৃহস্পতিবার থেকে কার্যত ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলায় দেশ থেকে খুব সীমিত তথ্যই বাইরে আসছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ওই সময় থেকে ইরানে প্রায় কোনো কার্যকর ইন্টারনেট সংযোগই নেই।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার দেশ এই আন্দোলনকে ‘সহায়তা করতে প্রস্তুত’। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ তিনি লেখেন, “ইরান হয়তো আগে কখনো না দেখা স্বাধীনতার মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র এতে সাহায্য করতে প্রস্তুত।”

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে সম্প্রতি ট্রাম্পকে অবহিত করা হয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি তিনি। উল্লেখ্য, গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্ত হয়েছিল ওয়াশিংটন।

শনিবার তেহরানের উত্তরাঞ্চলে আবারও লোকজন জড়ো হয়। এএফপি যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা পটকা ফোটাচ্ছে, হাঁড়ি-পাতিল বাজাচ্ছে এবং অপসারিত রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে। যাচাই না করা আরও কিছু ভিডিওতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারবিরোধী স্লোগানের দৃশ্য দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সাবেক শাহের পুত্র রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় আরও লক্ষ্যভিত্তিক বিক্ষোভের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য আর শুধু রাস্তায় নামা নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো শহরের কেন্দ্রগুলো দখল করা এবং নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রস্তুতি নেওয়া।”

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে শাসনকারী ধর্মতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষের জন্য এই বিক্ষোভ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। শুরুতে সরকার সংযমের আহ্বান জানালেও এখন তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

শুক্রবার এক ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘ভাঙচুরকারী’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্পের ইশারায় কাজ করার অভিযোগ তোলেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ‘উদ্বেগজনক’ তথ্য তারা বিশ্লেষণ করছে। নরওয়ে-ভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, দমন-পীড়নে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫১ জন নিহত হয়েছেন, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সংস্থাটি পূর্ব তেহরানের আলঘাদির হাসপাতালের মেঝেতে গুলিবিদ্ধ লাশের ছবি প্রকাশের দাবি করেছে।

শুক্রবার তেহরানের সাদাতাবাদ এলাকায় ‘খামেনির মৃত্যু চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এ সময় গাড়ির হর্ন বাজিয়ে অনেক মানুষ বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানান।

তেহরান ছাড়াও মাশহাদ, তাবরিজ এবং ধর্মীয় শহর কুমে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হামেদানে এক ব্যক্তিকে সিংহ-সূর্য খচিত শাহ আমলের ইরানি পতাকা ওড়াতে দেখা যায়। একই পতাকা লন্ডনে ইরানের দূতাবাস ভবনের বারান্দায়ও অল্প সময়ের জন্য উত্তোলিত হয়।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তেহরানে অবস্থানরত এএফপি সাংবাদিকরা রাস্তাঘাট ফাঁকা এবং শহরকে অন্ধকারে ডুবে থাকতে দেখেন। বিকেল চারটার দিকে এক ক্যাফে ম্যানেজার বলেন, “এলাকাটি এখন নিরাপদ নয়।”

অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে শনিবার শিরাজসহ বিভিন্ন শহরে নিহত নিরাপত্তা সদস্যদের জানাজা ও সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য প্রচার করা হয়।

ইরানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, “শৃঙ্খলা ও শান্তি বিঘ্নিত করতে চাওয়া শত্রুদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আমরা কঠোর অবস্থান নেব।”

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েনসহ বিশ্ব নেতারা সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘সহিংস দমন’-এর নিন্দা করেছেন।

শনিবার, ইরানে প্রথম কর্মদিবসে তেহরানের এক ব্যক্তি বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তিনি কাজের ই-মেইল পর্যন্ত দেখতে পারছেন না। তবে তিনি যোগ করেন, “জনগণের বিজয়ের আগে এই মূল্য আমাদের দিতেই হচ্ছে।”

সর্বশেষ

জনপ্রিয়