শনিবার ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:৫৪, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ সফর স্থগিত করল জাতিসংঘ প্রতিনিধিদল

বাংলাদেশ সফর স্থগিত করল জাতিসংঘ প্রতিনিধিদল
ছবি: সংগৃহীত

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি পর্যালোচনার জন্য চলতি মাসেই ঢাকায় আসার কথা ছিল জাতিসংঘের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের। একই সঙ্গে আগামী ২১ জানুয়ারি এলডিসি–উত্তরণ সংক্রান্ত একটি স্বাধীন প্রস্তুতিমূলক মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপনের সূচিও নির্ধারিত ছিল। তবে সফরের আগেই প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। নতুন কোনো তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সূত্র জানায়, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং পঞ্চম এলডিসি সম্মেলনের মহাসচিব রাবাব ফাতিমার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটির বাংলাদেশ সফরের কথা ছিল। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার এ সময়ে সফরটি না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাসে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ সফরে আসতে পারে।

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, এলডিসি থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য প্রভাব এবং উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি যাচাই করতে গত নভেম্বর মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করে জাতিসংঘ। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত প্রস্তুতি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, সফর স্থগিত হলেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে পাঠানো হবে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘জাতিসংঘ এখন না এলেও পরে আসবে। তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি আমরা নির্ধারিত সময়েই পেয়ে যাব। এরপর পরবর্তী প্রক্রিয়া এগোবে।’

এদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিতে ঘাটতির কথা তুলে ধরে ব্যবসায়ীরা উত্তরণ পেছানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। এলডিসি থেকে বের হলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। এতে রপ্তানি ৬ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এলডিসি উত্তরণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান খুব একটা ইতিবাচক নয়। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে ২৭টি সদস্য দেশের যেকোনো একটি দেশ আপত্তি জানালেই সেটিকে সম্মিলিত বিরোধিতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই), বিজিএমইএ ও আইসিসি বাংলাদেশসহ মোট ১৬টি ব্যবসায়ী সংগঠন গত ২৪ আগস্ট একযোগে সংবাদ সম্মেলন করে এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানোর দাবি জানায়। সরকার এই দাবির কথা জাতিসংঘকে জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত উত্তরণ পেছানোর বিষয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে লাওস ও নেপালও উত্তরণ পেছানোর উদ্যোগ নেয়নি।

বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা। তবে ব্যবসায়ীরা উত্তরণ পেছানোর দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ ২০২৬ সালেই হবে। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরণ পেছানোর আবেদন করবে না; নির্বাচিত সরকার চাইলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘তারা বড় পরিসরে একটি সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সামনে নির্বাচন থাকায় অল্প সময়ে তা আয়োজন করা সম্ভব নয়।’

ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যাবে। সেখানে উত্তরণ পেছানোর পক্ষে ৫১ শতাংশ ভোট পাওয়া সহজ নয়।’

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদন মিললে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও জলবায়ু ভঙ্গুরতার তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়ে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের পর্যালোচনার পর উন্নয়ন নীতি কমিটি ২০২৬ সালে উত্তরণের সুপারিশ করে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা চাই অন্তত তিন বছর উত্তরণ পেছানো হোক। কারণ প্রস্তুতির বড় ঘাটতি রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের যেমন কারিগরি দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার ঘাটতি আছে, তেমনি সরকারের ঘাটতিও কম নয়। অন্যান্য দেশে ব্যাংকঋণের সুদ ৫ শতাংশের নিচে থাকলেও আমাদের দেশে তা প্রায় ১৫ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা, সুশাসন ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাও রয়েছে। এসব সমস্যা রেখে শুধু নামমাত্র এলডিসি থেকে বের হলে প্রকৃত লাভ কী?’