পল কাপুরের ঢাকা সফর
আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার মিশন!
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনায় এসেছে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য পুনর্বাসন বা রাজনৈতিক পুনর্গঠনের বিষয়টি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। রাজনৈতিক মহল, কূটনৈতিক সূত্র এবং পর্যবেক্ষকদের মধ্যে এ নিয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ ও আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক মাসে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাকর্মীদের একটি অংশ আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে সাবেক নেতাদের ছোট ছোট বৈঠক, সাংগঠনিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎপরতা বাড়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে আওয়ামী লীগের কিছু কার্যালয় খোলার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
কিছু সূত্রের দাবি, দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান ধরে রাখতে স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ জোরদার করছেন। তবে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দল পুনর্গঠন বা পুনর্বাসন নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান দল বিএনপি এবং তাদের শরিকদের একটি অংশ অভিযোগ করছে, প্রশাসনের কিছু স্তরে এখনও আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সক্রিয় রয়েছেন। তাদের মতে, এসব কারণে দলটির পুনর্বাসনের একটি ‘নীরব প্রক্রিয়া’ চলতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর গত ৩ মার্চ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন। তিন দিনের সফরে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানসহ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি ঢাকা সফরের আগে দিল্লি সফর করেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক গঠনমূলক থাকুক, এটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা। ওয়াশিংটনের এই বার্তা পল কাপুর দুই দেশেই দিয়ে গেছেন। এর নেপথ্যেও রয়েছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় দলগুলোর সম্পূর্ণ বিলুপ্তি সাধারণত দেখা যায় না। বরং রাজনৈতিক পালাবদলের পর অনেক সময় দলগুলো নতুন নেতৃত্ব ও কৌশল নিয়ে আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। অতীতেও এমন প্রবণতা দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, আওয়ামী লীগ পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার জন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থান বহন করে। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
তবে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো দেশই প্রকাশ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তারা সাধারণত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অংশগ্রহণমূলক বা ‘ইনক্লুসিভ’ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। এ কারণেই তাদের কূটনৈতিক বক্তব্য বা যোগাযোগকে অনেক সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে।
নির্বাচনের আগে ঢাকায় অবস্থানরত কয়েকটি পশ্চিমা দেশের কূটনীতিক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ‘ইনক্লুসিভ পলিটিক্স’ বা সব দলের অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দেন। আকার-ইঙ্গিতে তারা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে তুলেছিলেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে নির্বাচন শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক বিবৃতিতে জানায়, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। মানুষ আগ্রহ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে গেছে এবং নির্ভয়ে ভোট দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর এ এস এম আমানউল্লাহ বলেন, দেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ একটা দল। এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের দায় কেউ নিবে বলে আমার মনে হয় না।
আওয়ামী লীগকে পূনর্বাসনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভূ-রাজনৈতিক কারণে এবং বাস্তবতা মিলে এটা খুবই কঠিন কাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভূ-রাজনৈতিত কারণে আমাদের দেশটার অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে পশ্চিমারা চাইবে না বাংলাদেশের সাথে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দূরত্ব থাকুক। তিনি বলেন, ভারতের সাথে আমাদের ঐতিহাসিকভাবেই একটা সুসম্পর্ক অনেক দিনের। তারা পলাতক হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে যে ভুল করেছে সেটা তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এখন তারা স্বাভাবিক সম্পর্ক করার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, জ্বালানী সঙ্কট মোকাবিলায় ভারত কিন্তু বাংলাদেশকে জ্বালানী তেল দিচ্ছে। এ থেকেই প্রমানিত হয়, ভারত বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে চায় বা চাচ্ছে।
সূত্র: ইনকিলাব



























