মঙ্গলবার ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৪৪, ২৭ জুলাই ২০২৬

মামলা করতে গিয়ে নিজেই ‘আসামি’

মামলা করতে গিয়ে নিজেই ‘আসামি’
ছবি: সংগৃহীত

বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে উলটো পুলিশের মামলার আসামি হয়েছেন সোনিয়া আক্তার কেয়া নামে এক নারী। শুধু তাই নয়, অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ওই নারীকে রাতভর মারধর করা হয়েছে। আর মামলায় তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশ সদস্যকে মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলা দেওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দুদিন কারা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। 

রাজধানীর রামপুরা থানা পুলিশের এই কাণ্ডের সত্যতা যুগান্তরের অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে। 

অনুসন্ধানে দেখা যায়, পূর্ব রামপুরার ২৪৮/৬/১ নম্বর মমতাজ ভিলার ভাড়াটিয়া সোনিয়া আক্তার কেয়া ২৭ মে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে দোহারে গ্রামের বাড়ি যান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফ্ল্যাটের চাবি রেখে যান বাড়িওয়ালার কাছে। কয়েকদিন পর ফিরে দেখেন আলমারিতে রাখা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও চেকবই খোয়া গেছে। এ নিয়ে বাড়িওয়ালা আলমগীরের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলে ৫ জুন তিনি রামপুরা থানায় অভিযোগ দিতে যান। কিন্তু অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায় পুলিশ। পরদিন খিলগাঁও জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) তৌফিক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সোনিয়াকে বলেন, ‘ওসিকে বলে দিচ্ছি। মামলা নেবে।’ এরপর থানা পুলিশ লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করে। তবে মামলা হিসাবে রেকর্ড করা হয়নি।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ৮ জুন রাতে তিনি আবার থানায় গিয়ে মামলা নেওয়ার অনুরোধ করলে রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন তার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি নারীর শরীর নিয়ে খারাপ মন্তব্য করেন এবং অনৈতিক প্রস্তাব দেন। প্রতিবাদ করলে প্রথমে ওসি তার বুকে আঘাত করেন এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করেন। দ্রুত তিনি থানা থেকে বের হয়ে এসিকে ফোনে কল করে বিষয়টি জানান এবং থানায় আসতে বলেন। এরপর তিনি ঘটনাটি ফেসবুক লাইভে প্রচারের চেষ্টা করলে পুলিশ তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে। পরে ওসি থানা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আটকান সোনিয়া। 

অনুসন্ধানে পাওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, রাত সোয়া ১০টার দিকে ওসির গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সোনিয়াকে এক পুলিশ সদস্য বলছেন, ‘আপনি ভেতরে যান, আপনার মামলা নেওয়া হবে।’ অথচ ওসির দাবি, এর আগেই তার অভিযোগ এফআইআর হিসাবে রেকর্ড করা হয়েছিল। নারীর বিরুদ্ধে দেওয়া মামলার নথিতেও এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়, সোনিয়ার দেওয়া অভিযোগ আগেই মামলা হিসাবে নেওয়া হয়। এরপরও তিনি খারাপ আচরণ করেন এবং পুলিশকে মারধর করেন। তবে ভিডিওচিত্রে পুলিশের বক্তব্যের অসংগতি পাওয়া যায়। 

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওসির গাড়ির সামনে থেকে তাকে থানার মহিলা হেল্প ডেস্কে নিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ঘণ্টাব্যাপী মারধর করেন। রাত ১২টার পর এসি তৌফিক আহমেদ থানায় পৌঁছালে তিনি তার সামনে পুরো ঘটনা তুলে ধরে বাসায় যেতে চান। কিন্তু এসি তাকে জানান, ওসি আসার পর সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। এরপর ওসি থানায় এলে আবারও সোনিয়াকে মারধর করতে করতে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গাড়িতে ওঠানোর পর ওড়না দিয়ে তার চোখ বেঁধে খিলগাঁও থানায় নেওয়া হয় এবং পুরো পথেই মারধর করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা এবং পুলিশ সদস্যকে মারধরের অভিযোগে খিলগাঁও থানায় মামলা দেওয়া হয়।

পরদিন সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ওই নারীকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয় খিলগাঁও থানা পুলিশ। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দুপুরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন ও ছেঁড়া কাপড় থাকা সত্ত্বেও তাকে বিচারকের সামনে নেওয়া হয়নি। রাখা হয়েছিল আদালতের হাজতখানায়। শুধু মামলার নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে সন্ধ্যায় তাকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হলে কারা কর্তৃপক্ষ তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে দুইদিন কারা হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়। সাতদিন কারাভোগের পর সোনিয়া জামিনে মুক্তি পান।

পুলিশের মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সোনিয়া রামপুরা থানার নারী কনস্টেবল আরিফা সুলতানাকে মারধর করেন। এ কারণে আরিফা মুগদা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু ৮ ও ৯ জুন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে ওই নামে কাউকে চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ওই হাসপাতালের রেকর্ড বুকে সোনিয়ার চিকিৎসার নেওয়া তথ্য রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘পুলিশের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। সেখানে নারী পুলিশ সদস্যকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা দেখা যায়।’ তবে সেই ফুটেজ দেখতে চাইলে ওসি অস্বীকৃতি জানান।

৯ জুন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্বরত ছিলেন চিকিৎসক ডা. আয়েশা আমিন। বর্তমানে তিনি বদলি হয়ে জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে কর্মরত আছেন। সোনিয়ার চিকিৎসাপত্র দেখিয়ে জানতে চাইলে ডা. আয়েশা আমিন বলেন, ‘সোনিয়া আক্তার কেয়ার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। সে অনুযায়ী তাকে ওষুধ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের নথিতেও তা উল্লেখ রয়েছে।’

সোনিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া এবং গ্রেফতারের বিষয়টি তার পরিবারকে জানানো হয়নি বলে তারা জানিয়েছেন। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর ১২ ঘণ্টার মধ্যে পরিবার বা আইনজীবীকে জানানো বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার এসআই সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা তাকে গ্রেফতার করিনি। রামপুরা থানা পুলিশ তাকে আমাদের থানায় দিয়ে মামলা করিয়েছে। এছাড়া তিনি আমাদের কাছে কোনো সহায়তা চাননি।’

আদালতে বিচারকের সামনে তাকে উপস্থাপন না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিচারক আসামি দেখবেন নাকি দেখবেন না, সেটি আদালতের এখতিয়ার।’ পুলিশের ওপর হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ রয়েছে সোনিয়া ২-৩ জন পুলিশ সদস্যকে মারধর করেছেন। তবে তদন্তের সব নথি তার হাতে পৌঁছেনি।’

জানা যায়, ভুক্তভোগী সোনিয়া একজন ডিভোর্সি নারী। তার কলেজপড়ুয়া ছেলে মো. ইয়াসিনকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। গ্রামের বাড়ি দোহারে। পেশায় তিনি অভিনয়শিল্পী। থানায় মারধরের ঘটনার দিন তার ছেলে এবং মাসহ অনেকেই এসেছিলেন। কিন্তু কারও সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ছেলে মো. ইয়াসিন বলেন, ‘মায়ের ফেসবুক লাইভ দেখে আমি, নানি ও আমার বন্ধু থানায় যাই। কিন্তু পুলিশ আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। বাইরে দাঁড়িয়ে মায়ের চিৎকার শুনতে পাই। পরে দেখি, পুলিশ মাকে মারধর করতে করতে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তখন আমাদের বলা হয়েছিল, তাকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।’

খিলগাঁও জোনের এসি তৌফিক আহমেদ বলেন, ‘সোনিয়া আমাকে ফোন করে থানায় আসতে বলেছিলেন। যানজট পেরিয়ে আমি রাত ১২টার পর থানায় পৌঁছি। ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে এবং ওসি ওই নারীর বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।’

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সোনিয়ার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার রাতেই তার বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগ এফআইআর হিসাবে রেকর্ড করা হয়। তবে ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তাকে না জানিয়েই ওই মামলা রেকর্ড করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তারিখ পরিবর্তনসহ বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছে। যদিও বাড়িওয়ালা আলমগীর সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সোনিয়ার বাসা থেকে কোনো কিছু চুরি হয়নি এবং তার সঙ্গে কোনো খারাপ আচরণও করা হয়নি।

সোনিয়াকে মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করে রামপুরা থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘ওই নারীকে মারধর করা হয়নি। তিনি থানায় এসে খারাপ ব্যবহার করেছেন। আমাদের একজন নারী পুলিশ সদস্যকে মারধর করেছেন। সেবা নিতে আসা অনেকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন।’

আর ডিএমপি মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘নারীর অভিযোগের কতটা সত্যতা রয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবু আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’ 

এ ঘটনায় সোনিয়া আক্তার কেয়া পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ এলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে। ডিএমপি কমিশনার বিষয়টি তদন্ত করবেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সূত্র: যুগান্তর

সর্বশেষ

জনপ্রিয়